দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে চট্টগ্রামের ৬ সংসদীয় আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নৌকার প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন হুইপসহ ৭ আওয়ামী লীগ নেতা। নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক করতে দলীয় প্রতীকের প্রার্থীর পাশাপাশি দলের যেকোনো নেতা বা ব্যক্তি স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারবেন, মূলত প্রধামমন্ত্রীর এমন ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে কোমর বেঁধে ভোটের মাঠে নামছেন দলের মনোনয়ন বঞ্চিত এ নেতারা। চট্টগ্রামের মীরসরাই, বন্দর-পতেঙ্গা, চন্দনাইশ, পটিয়া, সাতকানিয়া-লোহাগাড়া ও বাঁশখালী সংসদীয় আসনে দলের মনোনীত প্রার্থীর বাইরে তারা প্রার্থী হবেন বলে জানিয়েছেন। দলের বর্তমান একজন সংসদ সদস্যও ছাড়াও রয়েছেন চট্টগ্রাম উত্তর-দক্ষিণ ও নগর আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা এসব নেতারাফলে চট্টগ্রামের ১৬ আসনের মধ্যে ৬টিতে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
চট্টগ্রাম-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন পুত্র নতুন মুখ মাহবুব রহমান রুহেল। এ আসনে দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও মীরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক চেয়ারম্যান মো. গিয়াস উদ্দিন। এর আগেও তিনি দলের মনোনয়ন চেয়ে পাননি। আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে এবার নিজেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
গতকাল সোমবার বিকালে দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, সব ঠিকঠাক থাকলে ইনশাল্লাহ এবার আমি নির্বাচন করব। মিরসরাইবাসী আমার বন্ধু, আমি তাদের বন্ধু। বিগত ৫০-৫২ বছর ধরে আমি রাজনীতি করছি, উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে মিরসরাইবাসীর পাশে ছিলাম এখনও আছি। আমাদের প্রবীণ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন ভোট দাঁড়ালে আমি প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতাম না, যেহেত ছেলে ভোটে দাঁড়িয়েছে এবং তিনি এখনো যুবক সেহেতু সামনে তাঁর অনেক সময় আছে। আমার বার্ধক্য শুরু হয়েছে আর কয়দিন বাঁচব, আশা করছি জীবনের শেষ সময়ে মিরসরাইবাসীর সেবা করতে পারব। মূলত মিরসরাইয়ের জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে এবং সর্বস্থরের জনগণের সেবক হতে এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করব। সব ঠিক থাকলে জনগণ আমাকে বেছে নেবেন বলেও দাবি করেন তিনি।
চট্টগ্রাম-১১ বন্দর-পতেঙ্গা আসনে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন এম এ লতিফ। আসনটি থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন নগর আওয়ামী লীগের দুই সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন ও আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চু। এবার এ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতার ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বোর্ড সদস্য ও ৩৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমন।
জানতে চাইলে জিয়াউল হক সুমন বলেন, আমি আমার এলাকার জনগণের দাবি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভোটে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা করার ঘোষণায় আগ্রহী হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছি। আমি নির্বাচিত হলে বন্দর-পতেঙ্গা এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি সরকারী হাসপাতাল নির্মাণ এবং খেলার মাঠসহ উন্নয়ন কাজ তরান্বিত করার উদ্যোগ নেব। পাশাপাশি অত্র এলাকার মানুষের সেবায় সর্বদা নিয়োজিত রাখবেন বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। এছাড়া একই আসনে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চুও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন বলে গুঞ্জন চলছে।
চট্টগ্রাম-১২ পটিয়া আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোয়ন পেয়েছেন পটিয়া উপজেলা পরিষদের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী। এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরী। তিনি টানা তিনবার এই আসনের সংসদ সদস্য। এবার তিনি দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ঘোষণা দিয়েছেন।
জানতে চাইলে সামশুল হক দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, পটিয়ার মানুষ আজ কান্না করছে। ইতোমধ্যে নাগরিক কমিটি করে আমাকে ভোটে অংশ নিতে জোর অনুরোধ করেছেন। যেহেতু র্দীঘদিন জনপ্রতিনিধি হিসাবে সুখে-দুঃখে তাদের পাশে ছিলাম, সেহেতু তাদের আশার প্রতিফলন ঘটাতে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচনকে উৎসব মুখর ও প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ নির্বাচন করতে যে ঘোষণা দিয়েছেন তা বাস্তবায়নে ভোটে অংশ নেব। আশা করি অতীতের ন্যায় বারও ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন।
চট্টগ্রাম-১৪ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোয়ন পেয়েছেন বর্তমান সাংসদ নজরুল ইসলাম চৌধুরী। এ আসনে দল থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন সদ্য পদত্যাগী উপজেলা চেয়ারম্যান এবং কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ উপকমিটির সদস্য আবদুল জব্বার চৌধুরী। দল থেকে মনোনয়ন না পেয়ে এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
তিনি দেশ বর্তমানকে বলেন তিনি বলেন, আমি ১৯৮০ সাল থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম এবং জনপ্রতিনিধি হিসাবে এই এলাকায় ১৫ বছর ধরে কাজ করছি। প্রকৃতপক্ষে আমার এলাকার জনগণের চাপে আমি মনোনয়ন নিয়েছিলাম। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে দলের বাধা না থাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেব। আমি আমার এলাকার চাহিদা পূরণ করতে পারবো বলে বিশ্বাস করি বলেই এলাকার সর্বস্তরের সমর্থন ও ভোট পাব বলে আত্মবিশ্বাসী। সবঠিকঠাক থাকলে আগামী নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে জনগণের সেবা করবো বলেও বলেন তিনি।
চট্টগ্রাম-১৫ সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। এই আসনে দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ মোতালেব। সদ্য পদত্যাগী সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ মোতালেব এবার স্বতন্ত্র পার্থী হিসাবে ভোটে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বনফুল ও কিষোয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান।
মোতালেব দেশ বর্তমানকে বলেন, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। প্রকৃতপক্ষে আমার এলাকার জনগণের চাপে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দলের নেতা-কর্মীদের ভোটে অংশ নিতে সুযোগ দেওয়ায় আমি এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছি। দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি হিসাবে এলাকার মানুষের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমি আমার এলাকার চাহিদা পূরণ করতে পারব বলে বিশ্বাস করি। তাই এবার বিপুল ভোটে আমাকে জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ দেবেন তারা।
চট্টগ্রাম-১৬ বাঁশখালী আসনে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী। এই আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মুজিবুর রহমান। স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও দৈনিক পূর্বদেশ’র সম্পাদক মুজিবুর রহমান এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এছাড়াও একই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল্লাহ কবির লিটন। তিনি বলেন, বাঁশখালীবাসীর ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য এবং প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নে এবার আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। বাঁশখালীর আওয়ামী লীগসহ সকল অঙ্গসংগঠনের বেশিরভাগ নেতাকর্মী আমার সাথে আছে। মূলত, তাদের আশার প্রতিফলন ঘটাতে এবার নির্বাচনে অংশ নেয়া। আমি নির্বাচিত হলে বাঁশখালীর উন্নয়ন তরান্বিত করার পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণকে সেবা দিতে বদ্ধপরিকর। আশা করি, বাঁশখালীবাসী আমাকে নিরাশ করবে না।
এদিকে আগামী নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, পাহাড়তলী, হালিশহর) আসন থেকে স্বতন্ত্র পদে প্রার্থী হচ্ছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম। ওই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী মহিউদ্দিন বাচ্চু।
গত রোববার বিকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ২৯৮ আসনে নৌকার প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন। চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়াদের মধ্যে পাঁচজনই নতুন মুখ।
পাশাপাশি বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির এবং জাতীয় পার্টির বিভিন্ন প্রার্থী ফরম নিয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, বিএসএম, জাসদ, কল্যাণ পার্টি, বিএনএফ, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ফোরাম, তৃণমূল বিএনপি থেকে প্রার্থীরা ফরম নিয়েছেন। বাকিরা স্বতন্ত্র প্রার্থী।
দেশ বর্তমান/এআই