চট্টগ্রামে থামছে না সড়ক দুর্ঘটনা, বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

মোটরসাইকেল আরোহী ও নারীর সংখ্যা বেশী

চট্টগ্রামে নতুন বছরের শুরুতেই সড়ক দুর্ঘটনায় বেড়েছে মৃত্যুর মিছিল। প্রায় প্রতিদিনই ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় অকালে ঝরছে বহু প্রাণ। আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছে অসংখ্য মানুষ। দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনা রোধে যেমন নেই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ, তেমনি নেই জনসচেতনতাও। চলতি জানুয়ারিতেই সড়ক দুর্ঘটনায় চট্টগ্রামে প্রাণ হারিয়েছে ৯ জন। আহত অন্তত অর্ধশতাধিক। বেপরোয়া গতি, অদক্ষ ও অশিক্ষিত চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব, যাত্রী ও পথচারীদের অসচেতনতা, চালকের মোবাইল ফোন ব্যবহার, ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন অমান্য, সড়কে চালকের প্রতিযোগিতা ও উদাসীনতার কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করছেন ট্রাফিক পুলিশ।

সর্বশেষ গত সোমবার (২২ জানুয়ারি) বিকালে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের নয়াপাড়া মসজিদের সামনে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ট্রাকচাপায় ৩ জন মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন, লোহাগাড়ার পদুয়া এলাকার জালাল আহমদের ছেলে মো. আবছার (৪০), চুনতি এলাকার আব্দুল কাদেরের ছেলে জুবায়ের (২৫) ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বাবুলের ছেলে মো. জাহেদ (২৭)।

এর আগের দিন ২১ জানুয়ারি রাতে কর্ণফুলী উপজেলার জামালপাড়া এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় মো. জিহাদ (২২) নামের এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। নিহত জিহাদ বাঁশখালী উপজেলার জহির উদ্দিন হেলালের ছেলে।

১৫ জানুয়ারি ভোরে সীতাকুণ্ডের পোর্ট লিংক কনটেইনার ডিপোতে কন্টেইনার কালমারের চাকায় পিষ্ট হয়ে মো. সালাউদ্দীন (৫২) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। নিহত সালাউদ্দীন (৫২) নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার শীধরপুরের হাবীবুল্লাহ’র ছেলে।

একইদিন সোমবার ভোরে নগরীর পাহাড়তলী থানাধীন কর্নেল হাট ওভারব্রিজের নিচে দ্রুতগতির শ্যামলী বাসের ধাক্কায় পরীজান বিবি (৬৫) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি কর্নেল হাটের মকিম তালুকদার বাড়ির ওয়াহিদ উল্লাহ’র স্ত্রী।

১২ জানুয়ারি রাতে বোয়ালখালীর উপজেলার কালুরঘাট-বেঙ্গুরা সড়কের একটি কালভার্টের সাথে ধাক্কা লেগে আবদুল্লাহ আল হোসাইন (২০) নামের এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে। আবদুল্লাহ কুমিল্লার চান্দিনা থানার মাইচখার ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড কালেমসার হাজী বাড়ির মো. হুমায়ুন কবীরের ছেলে।

৬ জানুয়ারি সকালে হাটহাজারীর ইসলামিয়া হাট এলাকায় রাস্তা পারাপারের সময় ট্রাক চাপায় মরিয়ম বেগম (৫০) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়। তিনি উত্তর মাদার্শা রহমত ঘোনা এলাকার মোহাম্মদ মিয়ার স্ত্রী।

১ জানুয়ারি সকালে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার হোছনাবাদ ইউনিয়নের নিশ্চিন্তাপুর লালশাহ মুয়াজ্জেম মাজার সংলগ্ন সেগুন বাগিচা সড়কে চাঁদের গাড়ির (জিপ) ধাক্কায় আবদুল কুদ্দুস (৪০) নামে এক ভ্যানচালক নিহত হয়েছে। তিনি ওই এলাকার চুন্নুর টেক গ্রামের মৃত হাফিজুর রহমানের ছেলে।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক দেশ বর্তমানকে বলেন, প্রায় প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় আহতরা হাসপাতালে ভর্তি হন। বেশীরভাগ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলেও তাদের মধ্যে অনেকেই গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে। চলতি মাসে আহত হয়ে প্রায় ৫০-৬০ জন চিকিৎসা নিতে আসেন বলেও জানান পুলিশ ফাঁড়ির এই ইনচার্জ।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’র চট্টগ্রাম নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক শফিক আহমেদ সাজিব দেশ বর্তমানকে বলেন, সারাদেশের ন্যায় চট্টগ্রামেও সড়ক দুর্ঘটনার বেড়ে চলছে। এ সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ট্রাফিক পুলিশ বিভাগে দায়িত্বরতদেরকে সড়কে চালকদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। আর চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতাপ্রবণ মনোভাব কমাতে হবে এবং পথচারীদেরকেও আরও সচেতন হতে হবে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ ট্রাফিক উত্তর বিভাগের উপ-কমিশনার ও অতিরিক্ত ডিআইজি জয়নুল আবেদীন দেশ বর্তমানকে বলেন, চট্টগ্রাম নগরীতে ২৫ ভাগ সড়কের স্থলে আছে ৭ ভাগের মতো, তাছাড়া অপর্যাপ্ত সড়কের নকশা অনেক ক্ষেত্রে ভুল আছে, যার জন্য ধারণ ক্ষমতার চেয়ে গাড়ির চাপ এবং মানুষের চাপ অনেকটা বেড়ে যাওয়ায় সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, পৃথিবীর কোথাও ফ্লাইওভারে গতিরোধক নেই কিন্তু অমাদের চট্টগ্রামে ফ্লাইওভারে গতিরোধক আছে যাতে দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়াও চালক এবং পথচারীদের অসচেতনতার কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। আমরা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সচেতনা বৃদ্ধিসহ আইনের কঠোর প্রয়োগ করেই চলছি।