হতাশা আর লোকসানের চাপ নিতে না পেরে চট্টগ্রামে এক বছরে ৩৬১টি পোশাক কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন মালিকরা। বন্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও অর্ধ শতাধিক কারখানা। বৈশ্বিক মন্দা, করোনার ধাক্কা, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, রফতানি আদেশ কমে যাওয়া, জ্বালানী তেলের মূল্য ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় একের পর এক কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছেন মালিকরা। সংকট উত্তরণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বন্ধের ঝুঁকিতে পড়বে আরও অর্ধ শতাধিক কারখানা।
বাংলাদেশের রফতানি আয়ের বড় দুটি খাতের একটি রফতানিমুখি তৈরি পোশাক শিল্পটি,অন্যটি প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স)। পোশাক রফতানিকারকদের প্রতিষ্ঠান-বিজিএমইএ সূত্রে জানা যায়, আশির দশকের শুরুতে চট্টগ্রামে রফতানিমুখি পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু। এ সময় চট্টগ্রামের কালুরঘাটে স্থাপিত হয় ‘দেশ গার্মেন্টস লি.। এটি দেশের প্রথম রফতানিমুখী কারখানা। সাবেক সচিব কুমিল্লার বাসিন্দা নুরুল কাদের খান এটির মালিক। আশি ও নব্বই দশকে পোশাক শিল্পের প্রসার ঘটলেও এর ধারাবাহিকতার ছন্দপতন ঘটে। ভৌগলিক কারণ ও চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক সুবিধার কারণে শুরুর দিকে দেশি-বিদেশি বহু কোম্পানী চট্টগ্রামে পোশাক কারখানা স্থাপন করলেও পরবর্তীতে সম্ভাবনার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে আসে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৮৫ পর্যন্ত চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠানটির সদস্যভুক্ত রফতানিমুখী শিল্প কারখানার সংখ্যা ছিল ১২৬টি। ওই সময় বন্ধ হয়ে যায় ৭টি কারখানা। দশ বছর পর চট্টগ্রামে পোশাক কারখানা তিন গুণ বৃদ্ধি পায়। ১৯৯৫ সালে ৩৫৯টি কারখানার মধ্যে চালু ছিলো ৩৪৫টি। অর্থাৎ দশ বছরে বন্ধ হয় ১৪টি। পরবর্তী সময়ে পোশাক কারখানায় বড় ধরণের ধাক্কা লাগে। ২০০৫ সালে নিবন্ধিত ৬৯৯টি কারখানার মধ্যে উৎপাদনে ছিলো ৬১০টি। অর্থাৎ দশ বছরে আর্থিক সংকটে পড়ে ৮৯টি কারখানা গুটিয়ে ফেলে মালিকরা। পরবর্তী দশ বছরের পোশাক কারখানার পরিস্থিতি আরো করুণ। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিজিএমইএর নিবন্ধিত ৭৫৬টি কারখানার মধ্যে নানা সংকটের কারণে ৩০১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। ২০২০ সাল পর্যন্ত পরবর্তী পাঁচ বছরে বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত পোশাক কারখানা কমে ৬৯৩টিতে দাঁড়ায়। এ সময়ের মধ্যে বন্ধ হয়েছে ৪০০টি কারখানা। ২০২১ সালে চট্টগ্রামে ৬৯৮টি পোশাক কারখানার অস্তিত্ব থাকলেও উৎপাদনে ছিলো ৩০৯টি। বিদায়ী বছর পর্যন্ত চট্টগ্রামে বিজিএমইএ নিবন্ধিত রফতানিমুখী পোশাক কারখানার সংখ্যা ৬৪১টি। এরমধ্যে ২৮০টি বন্ধ হয়ে গেছে। তথ্য মতে, প্রতিবছর নানা কারণে অনেক রফতানিমুখী পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
সৃষ্টি হচ্ছে নতুন উদ্যোক্তা। প্রতিষ্ঠিত কিছু শিল্প মালিক নতুন ইউনিট স্থাপন করে ব্যবসার সম্প্রসারণ করছেন। আবার অনেকে চট্টগ্রাম থেকে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। যার কারণে চট্টগ্রামে পোশাক কারখানার সংখ্যা কমে আসছে। কর্মহীন হয়ে পড়ছে পেশাক শ্রমিক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৩ সালে ঢাকার সাভারের রানাপ্লাজায় বড় ধরনের দূর্ঘটনার পর রফতানিমুখী পোশাক কারখানায় বিপর্যয় নেমে আসে। নারা শর্ত জুড়িয়ে দেয় অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্স। এছাড়া রফতানি আদেশ না থাকা, জ্বালানী তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণ পেতে নানা জটিলতা সর্বোপুরি আর্থিক সঙ্কটের কারণে খাদের কিনারায় এসে দাঁড়ায় পোশাক শিল্প। রানাপ্লাজার বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার পর পোশাক খাত যখন ইতিবাচক ধারায় মোড় নেয় তখন ২০১৯ সালের মার্চে করোনার আঘাতে নতুন সংকটে পড়ে রফতানিমুখী পোশাক খাত। এখনও পোশাক খাত সংকটের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে নানা সংকটের ইংগিত দিয়েছেন।
পোশাক রফতানিকারকরা বলছেন, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারের উপর বাংলাদেশের পোশাক খাত টিকে আছে। কিন্তু এসব দেশের ক্রেতারা তুলনামূলকভাবে খরচ কম বিধায় চীন ও ভিয়েতনামের বাজারের দিকে ঝুঁকছে। যার ফলে পশ্চিমা বাজার বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেশ বর্তমানকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা বাংলাদেশের পোশাক মালিকদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সংকটে যাচ্ছে দেশের পোশাক খাত। পশ্চিমা দেশগুলো রফতানি আদেশ কমিয়ে দিয়েছে। তারা পণ্যের দাম কমাতে চায়। এদিকে ডলার সংকটের কারণে কাঁচামালের দাম বেড়েছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। যার কারণে অনেক মালিক কারখানা গুটিয়ে নিয়েছে।