ঈদ কেনাকাটায় শেষ মুহূর্তে জমজমাট বিপণি বিতানগুলো

প্রচন্ড গরম ও তাপদাহকে উপেক্ষা করে শেষ মুহূর্তে জমে উঠেছে চট্টগ্রামের বিপনি বিতানগুলো।  কেনাকাটায় ব্যস্ত সাধারণ মানুষ।  প্রিয়জনদের জন্য পছন্দের জামা কাপড় কিনতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে মার্কেটগুলোতে। পরিবার পরিজনের সাথে নতুন কাপড় পরে ঈদের খুশি ভাগাগাভাগি করতে মানুষ ছুটে যাচ্ছেন ঈদ বাজারে। এদিকে ব্যবসায়ীরাও প্রাণ ফিরে পেয়েছেন বেচাকেনায়।  বিরামহীন চলছে বাণিজ্য।  রমজানের প্রথম দিকে কাস্টমারদের তেমন সাড়া না মিললেও এখন মার্কেটগুলো ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে।  তবে পোশাকের দাম বেশি হওয়ায় গুণতে হচ্ছে বাড়তি টাকা এমনই অভিযোগ ক্রেতাদের।

ক্রেতারা বলেন,  গতবারের তুলনায় এবার বাজারে কাপড়ের দাম অনেক বেশি।  বলতে গেলে প্রায় দ্বিগুণ। তাই দেখে শুনে পছন্দের জিনিস কিনতে ঘুরছেন মার্কেট থেকে মার্কেটে।  বাচ্চাদের কাপড়ের দাম তুলনামূলক বেশি বলে জানালেন ক্রেতারা।  এছাড়া কিছু কিছু শোরুমে পাঞ্জাবি বিক্রি হচ্ছে অনেক বেশি মূল্যে অভিযোগ ক্রেতাদের। তবে এ অভিযাগ মানতে নারাজ ব্যবসায়ীরা।  ডলারের দাম বাড়তি হওয়ার কারণে কাপড় সরবরাগহ এর প্রভাব পড়েছে।  তাই একটু দাম পড়ে যাচ্ছে।

এদিকে রোববার (১৬ এপ্রিল)  চট্টগ্রাম নগরীর স্যানমার ওশান সিটি, শপিং কমপ্লেক্স, সেন্ট্রাল প্লাজা, ইউনেস্কো সিটি সেন্টার ও আখতারুজ্জামান সেন্টারে ঘুরে নারী ও কিশোর-কিশোরীদের উপস্থিতি বেশ লক্ষ্য করা গেছে।

চিটাগাং শপিং কমপ্লেক্সে মাতৃছায়া বুটিকসের কর্মচারী  মো. আলাউদ্দিন বলেন, দেশি বুটিকসের মধ্যে অরগেঞ্জা, গ্রাউন নায়রা, ইন্ডিয়ান চিনন, আড়ং কটন, সামো সিল্ক, জর্জেট সহ নানন রকম থ্রি পিস পাওয়া যাচ্ছে। দুই হাজার থেকে চার হাজারের মধ্যে এ পোশাকগুলো পাওয়া যাচ্ছে।  এবারের ঈদে গ্রাহকদের পছন্দের মধ্যে রয়েছে অরগেঞ্জা থ্রিপিস বলে জানান তিনি।

একই মার্কেটের রূপসী শাড়ির কর্মচারী মো নিজামউদ্দিন বলেন, শিপন, অরবেঞ্জা, খাড্ডি শিপন, খাড্ডি সিল্ক, সেমিকাতান, ক্রেপ সিপন সহ বেশ কিছু নামি দামি শাড়ি রয়েছে এখানে। এসকল শাড়ি তিন থেকে দশ হাজারের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।  এছাড়া দেশি শাড়ির মধ্যে সুতি, টাঙাইল, পাবনা, মিরপুর সহ বেশ কিছু আইটেম, যেগুলো এক হাজার থেকে দুই হাজারের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।

দেশিয় পোশাকে বাড়তি দাম নিয়ে তিনি বলেন, মূলত দেশি শাড়ি তৈরিতে প্রিন্টিং, ড্রাইং সহ বেশ কিছু ধাপ রয়েছে যেগুরোতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেটার প্রভাব কিছুটা কাপড়ের উপরও পড়েছে। এছাড়া আমদানী শুল্ক বেড়ে যাওয়ায় বাইরের শাড়িগুলো কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রাম শপিং কমপ্লেক্সে পরিবার নিয়ে কেনাকাটা করতে আসা দিদারুল হক বলেন, এটি চট্টগ্রামের একটি পুরোনো মার্কেট।  এখানে বাসা বাড়ি সরঞ্জাম থেকে শুরু করে ছেলে মেয়ে, নারী-পুরুষ সকল ধরনের কাপড় পাওয়া য়ায় বলে আসি। এ মার্কেটে মোটামুটি সব কিছু তুলনামূলক কম মূল্যে পাওয়া যায় বলেন তিনি।

স্যানমার ওশান সিটির শৈল্পিকের ম্যানেজার জানান, চট্টগ্রামে তাদের ৩৪ টি আউটলেট রয়েছে। নারী পুরুষের সকল পোশাকের জন্য বেশ জনপ্রিয় এই শৈল্পিক।  বিশেষ করে ঈদে পাঞ্জাবীর জন্য পুরুষেরও পছন্দের শীর্ষে শৈল্পিক। দেশি বিদেশী পাঞ্জাবীর পসরা সাজিয়েছেন এবার তারা।  দুই থেকে ছয় হাজারের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে এসব পাঞ্জাবী। ইন্ডিয়ান পাঞ্জাবীগুলোর দাম কিছুটা বেশি বলে জানান তিনি।

এছাড়া নিজেদের গারমেন্টে তৈরি হয় তাদের বেশির ভাগ পোশাক।  পুরুষের জন্য পাঞ্জাবী, শার্ট, টি-শার্ট, জিন্স-গাবাডিন, পায়জামা সহ মেয়দের থ্রি পিস, টপ, ওয়ান পিস, জিন্স পাওয়া যাচ্ছে এখানে।  এছাড়াও আছে ওয়ালেট, বেল্ট, টাই সহ খুটিনাটি অনেক কিছু।

বেচা বিক্রির সম্পর্কে তিনি বলেন, দর্শনার্থীদের আগমনে সরগরম থাকলেও বিক্রি তেমন নেই।  গত বছরের তুলনায় এবার ব্যবসা প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ কম।  যদিও শৈল্পিকে গত বছরের তুলনায় পণ্যের দাম এবার প্রায় অপরিবর্তীত আছে বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রামের সেন্ট্রাল প্লাজায় এন্টিক শপের মিজানুর রহমান বলেন, পাঁচ বছর ধরে মার্কেটে আছেন তারা।  গ্রাহকেরও বেশ ভাল সাড়া পেয়েছেন।  তারা মূলত মেয়েদের জুতা, স্যান্ডেল, নাগরা, হ্যান্ড-ব্যাগ সহ বেশ কিছু আইটেম বিক্রি করে থাকেন। পাকিস্তানী নাগরা জুতা বাইরে থেকে আমদানী করে থাকেন তারা।  হাতে তৈরি এসব জুতা যেগুলোর দাম দেড় হাজার থেকে তিন হাজার পর্যন্ত পড়ে যায়।  মেয়েদের বুটস পাওয়া যাচ্ছে তিন-চার হাজার টাকায়। ক্যাডস, থাইল্যান্ডের স্যু মেয়েদের যেগুলো পাট ও কটনের মিকসে তৈরি- এ গুলো পাওয়া যাচ্ছে দুই থেকে আড়াই হাজারের মধ্যে।  মেয়েদের স্যান্ডেল সু পাওয়া যাচ্ছে দুই হাজার টাকায়। এসকল  পন্যের বেশির ভাগই আমদানী করা হয় থাইল্যান্ড ও চায়না থেকে। বর্তমানে চট্টগ্রামে তাদের ১২ টি আউট লেট রয়েছে। যার মধ্যে সেন্ট্রাল প্লাজায় আছে দুটি। এছাড়াও বালি আর্কিড, নিউ মার্কেট, অলংকার, ইপিজেড, লালদীঘিতে তাদের সোরুম রয়েছে।

এদিকে নগরীর ইউনেস্কো সিটি সেন্টারে ভাইব্রেন্ট শোরুমের ম্যানেজার হাসান বলেন, এবার ঈদ বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও ভাইব্রেন্টের প্রোডাক্টগুলোর দাম বিগত বছরের ন্যায় অপরিবর্তিত রয়েছে। তাদের শোরুমে ম্যানস সুতে ৩০% ছাড় চলছে। এ দোকানে গ্রামীণ ফোন স্টার গ্রাহকদের জন্য ১৫% ডিসকাউন্ট ও কার্ড প্রেমেন্টে গ্রাহকদের জন্য রয়েছে ১০-১৫% ডিসকাউন্ট। ২০২১-২২ সালে ভাল সাড়া পেলেও এবার বেচা বিক্রি তুলনামূলক কম বলে জানালেন তারা।

একই মার্কেটের আতর, টুপি, জায়নামাজ বিক্রয় করা সুন্না-ওয়ে দোকানের মুত্তাকির বিল্লা হাসিব বলেন, তাদের মূল বিপণন হচ্ছে বিভিন্ন দেশের আতর, টুপি, জায়নামাজ, পাঞ্জাবী সহ বিবিধ পণ্য। এছাড়াও আছে পোশাক ও ঘরকে সুগন্ধী করার বিভিন্ন পণ্য। মূলত আতর খুবই বিলাসবহুল সুগন্ধী বলে জানালেন তারা। তাদের দোকানে দুই ধরনের আতর পাওয়া যায় ওয়েষ্টার্ন ও এরাবিয়ান। যেগুলো ১০০ ভাগ হালাল ও এলকোহল ফ্রি।

এরাবিয়ান আতরের মধ্যে মাস্ক, এম্বার, ওদ, সেন্ডাল, মিসকান বাদ, ওদ আসাম, ওদ ভিয়েতনাম, মুখালাদ(মিক্স) সহ বিবিধ আইটেম রযেছে।  এসকল আতর ৩মিলি বোতল ১২০ টাকা থেকে ২২০০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এরাবিয়ান বা ক্লাসিক আতর পাওয়া যাচ্ছে ৩ মিলি বোতল ১৮০ টাকা থেকে এক হাজার টাকায়। এসব আতরের মধ্যে সবচেয়ে দামি হচ্ছে কম্বডিয় ওদ। যেটির ৩মিলির দাম পরে সাড়ে সাত হাজার টাকা। এছাড়াও চাইনিজ ও ইন্ডিয়ান রুমাল, টারকিশ জায়নামাজ, হ্যন্ড মেইড বাংলাদেশি টুপি; বগুড়া-সিরাজগঞ্জ সহ বেশ কিছু জায়গার টুপি রয়েছে। ২৫০-৫০০ টাকার ভেতর পাওয়া যাচ্ছে এসব টুপি। এছাড়াও রয়েছে পাকিস্তানি মিশরি ইন্দোনেশিয়ান আফগানী সৌদি টার্কিস ও আফ্রিকান টুপি।  বেচাকেনা সম্পর্কে তিনি বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায়  এ বছর  বেচা বিক্রি কম।  প্রতি বছর ১৫ রমজানের পর থেকে ক্রেতাদের চাপ থাকলেও এবার ননেই।

ঈদের বাকী আর মাত্র কয়েকদিন।  তাই শেষ মুহূর্তে পছন্দের পোশাকটি কিনতে মানুষ ভিড় জমাচ্ছে নগরীর মার্কেটগুলোতে। দামে মিললেই লুফে নিচ্ছেন পছন্দের পোষাক।  আসন্ন ঈদে প্রিয়জনদের মুখে হাঁসি ফোঁটাতে আবহাওয়া ও দামের তীব্র উত্তাপ এড়িয়ে এভাবেই চলছে কেনাকাটা।