দেশে ওষুধের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রাম নগরীর হাজারি গলি। সেখানকার ২২টি মার্কেটে প্রায় পাঁচশ ওষুধের দোকান রয়েছে। এসব ফার্মেসিতে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কোটি টাকার ওষুধ কেনাবেচা হয়। কিন্তু সেখানে অধিকাংশ ফার্মেসিতে বিক্রি হয় ভেজাল, মানহীন ও অবৈধ ওষুধ। চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় ফার্মেসিগুলোতে এসব ওষুধ বাজারজাত হচ্ছে। এসব ভেজাল ওষুধ কিনে খেয়ে সুস্থ হওয়ার বদলে মানুষের শরীরে বাসা বাঁধছে নানারকম রোগ।
বিগত ৮ বছর আগে হাজারি গলিতে অভিযান চালাতে পারতো না প্রশাসন। প্রশাসন অভিযানে গেলে দোকানপাট বন্ধ রেখে আন্দোলনে নেমে যেতেন ব্যবসায়ীরা। এমনকি ২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর হাজারি গলিতে ভ্রাম্যমান আদালতের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। ২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারি তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম হাজারি গলিতে অভিযান চালাতে সির্ভিল সার্জনকে সরাসরি নির্দেশ দেন। কিন্তু ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে পড়ে ফিরে আসতে হয়েছে ভ্রাম্যমান আদালতকে। এরপর ২০১৬ সালের ২৭ জুন হাজারি গলিতে সাঁড়াশি অভিযান চালায় র্যাব। সেই অভিযানে ৫ কোটি টাকার ভেজাল ওষুধ উদ্ধার করা হয়। এরপর থেকে মাঝে মাঝে হাজারি গলিতে অভিযান চালিয়ে আসছে জেলা প্রশাসন ও ওষুধ প্রশাসন।
সর্বশেষ গত ১৭ জানুয়ারি জেলা প্রশাসন ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর হাজারি গলিতে অভিযান চালায়। অভিযানে দুটি গোডাউনের তালা ভেঙে ও ছয়টি দোকানে অভিযান চালিয়ে ৪০ লাখ টাকার ভেজাল ও অবৈধ ওষুধ উদ্ধার করা হয়। অভিযানে ছবিলা কমপ্লেক্সের তৃতীয় তলার একটি এবং চতুর্থ তলার আরেকটি গুদামের তালা ভাঙা হয়। এর আগে ২০২১ সালের ১৩ এপ্রিল জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে হাজারী গলির চারটি ওষুধের দোকানকে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করে। ২০২০ সালের ৭ জুন হাজারি গলিতে জেলা প্রশাসনের একসঙ্গে চারজন ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান চালান। নকল ওষুধ বিক্রির দায়ে কয়েকটি ফার্মেসিকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
জেলা প্রশাসন ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে ভেজাল ওষুধ উদ্ধার ও মোটা অংকের জরিমানা করলেও তেমন ফল মিলছে না। দফায় দফায় অভিযানের পরও হাজারি গলিতে ভেজাল ওষুধ বিক্রি বন্ধ হচ্ছে না।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, হাজারী গলিতে ভেজাল ওষুধ বেচাকেনার সাথে জড়িত বেশকিছু ফার্মেসির ৪৫টি গোডাউন চিহ্নিত করা হয়েছে।
এগুলো হলো- হাজারী গলি বিজয় বিতান মার্কেটের নিচ তলায় মেসার্স শামস ফার্মেসির মালিক সুজত দাস বাবুর ৩টি গোডাউন, জিসি মার্কেটের নিচ তলায় মেসার্স অনুপমা ড্রাগের মালিক জুয়েলের ২টি গোডাউন, রাজলক্ষী মার্কেটের নিচ তলায় শান্তি ফার্মেসির মালিক শিবু প্রসাদের ১টি এবং মোহাম্মদীয়া মার্কেটের নিচ তলায় ১টি গোডাউন, আজম প্লাজা মার্কেটের নিচতলায় পপুলার মেডিকেল হলের মালিক বিক্রম দাশের ১টি গোডাউন, সূর্য মার্কেটের নিচ তলায় মুনস্টার ফার্মেসির মালিক স্বরুপ দাশের ওই মার্কেটের ২য় তলা ও ৩য় তলায় ২টি গোডাউন, খাজা মার্কেটের নিচ তলায় রুদ্র ফার্মেসির মালিক অলক দাশের ১টি গোডাউন, আর এস প্লাজার নিচ তলায় বিএন মেডিকোর মালিক রাজু দের ১টি গোডাউন, ছবিল কমপ্লেক্সের ২য় তলায় নূরজাহান ফার্মেসির মালিক মোহাম্মদ ইমরানের ৪টি গোডাউন, জহুর শপিং মার্কেটের নিচ তলায় মা ফাতেমা ফার্মেসির মালিক মো. শাহজাহানের ২টি গোডাউন, রশিদ মার্কেটের নিচ তলায় নিবারণ ফার্মেসির ২টি গোডাউন, মসজিদ গলির নিচ তলায় মকবুল ফার্মেসির মালিক মো. হেলালের ২টি গোডাউন, শাপলা বিতানের নিচ তলায় দ্য ইস্টার্ন ট্রেডার্সের মালিক মানিক চন্দ্র দের ১টি গোডাউন, রাজলক্ষী মার্কেটের নিচ তলায় রাজিব ড্রাগের ১টি গোডাউন, ছবিল কমপ্লেক্সের ২য় তলায় অংকন ফার্মেসির মালিক দিলীপ সুশীলের ১টি এবং এই মার্কেটের ২য় তলায় প্যাসিফিকের ২টি গোডাউন, মোহাম্মদীয় মার্কেটের নিচ তলায় জনতা সার্জিক্যাল দোকানের উপরে গোডাউন, জহুর শপিং মার্কেটের নিচ তলায় যমুনা ফার্মেসির মালিক লিটন দাশের ২টি গোডাউন, জিসি মার্কেটের নিচ তলায় জ্যোতি ফার্মেসির ২য় তলায় গোডাউন, হার্ডিঞ্চ প্রেস মার্কেটের নিচতলায় লুনা মেডিকোর ২য় তলায় গোডাউন, একই মার্কেটের নিচ তলায় কেয়ার এন্ড কিউ দোকানের ২য় তলায় গোডাউন, রনধীর মার্কেটের ২য় তলায় ভোলা নাথ মেডিকোর মালিক তপন দাশের দোকানের উপরে গোডাউন, জহুর শপিং মার্কেটের নিচ তলায় সুজয় ফার্মেসির মালিক সুজয় দাশের ৩টি গোডাউন, খাজা মার্কেটের নিচ তলায় মেসার্স পিউ ড্রাগের মালিক সজল চৌধুরীর ১টি গোডাউন, রশিদ মার্কেটের নিচ তলায় নিউ ফেয়ারের মালিক লিটন দাশের দোকানের ভিতরে লাগেজের মাল এবং পুরান গির্জা কমিউনিটি সেন্টারের নিচে সুমন ফার্মেসির ৩টি গোডাউন।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন রাজু বলেন, ‘এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী হাজারী গলিতে ভেজাল ওষুধ বিক্রি করছে। ভেজাল ওষুধ বেচাকেনার সাথে জড়িত বেশকিছু ফার্মেসিকে আমরা চিহ্নিত করেছি। গত ১৭ জানুয়ারি হাজারি গলিতে অভিযান চালিয়ে আমরা দুটি গোডাউনের তালা ভেঙে ভেজাল ওষুধ জব্দ করেছি। পরে সেখানকার আরও ৬টি ফার্মেসিতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অনুমোদনহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিন্মমানের ওষুধ জব্দ করেছি। সামনে আবারও আমরা সেখানে অভিযান চালাবো।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মানসম্পন্ন কোম্পানির যেসব ওষুধ ভালো ও বেশি চলে সেসব ওষুধের নামের সঙ্গে মোড়ককেও হুবহু নকল করে উৎপাদন করা হচ্ছে মানহীন ওষুধ। গ্রাম-গঞ্জে বিভিন্ন ফার্মেসীর মাধ্যমে তারা এসব ওষুধ বাজারজাত করছে। পরীক্ষা ছাড়া নকল ওষুধ যাচাই করা সম্ভব না হওয়ার সুযোগকে পুঁজি করে অখ্যাত কোম্পানিগুলো বাজারে দাপটের সঙ্গে ওষুধকে পণ্য বানিয়ে ব্যবসা করছে। এসব ওষুধ ক্রয় করে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা।
বৃহস্পতিবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে হাজারি গলিতে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক দোকানে প্রকাশ্যে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে ভেজাল ও অবৈধ ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে সরকারী জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল ও আমদানি নিষিদ্ধ ভারতীয় বিভিন্ন ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে। মানসম্পন্ন কোম্পানির যেসব ওষুধগুলোর চাহিদা বেশি সেসব ওষুধকে হুবহু নকল করে বাজারজাত করেছে অখ্যাত কোম্পানিগুলো। স্কয়ার কোম্পানির বহুল প্রচলিত কয়েকটি ওষুধ বিশেষ করে মাল্টিভিটামিন ফিলওয়েল গোল্ড, সিভিট, ক্যালবো ট্যাবলেট ও এন্টিবায়োটিক জিম্যাক্স ট্যাবলেট, এসকেএফ কোম্পানির গ্যাস্ট্রিকের লোসেকটিল ক্যাপসুল, ইনসেপ্টা কোম্পানির গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ প্যানটোনিক্স ট্যাবলেট, রেনাটা কোম্পানির ব্যাথানাশক ট্যাবলেট রোলাক এবং অপসোনিন কোম্পানির ডেকাসন ট্যাবলেট নামের সঙ্গে মোড়ককেও হুবহু নকল করে বাজারজাত করেছে বিস্ট্রল, ফার্মিক, এলবিয়ন, ইনোভা, প্রিমিয়ার, রাসা, ইউ এস ল্যাবরেটরীসহ আরো কয়েকটি মানহীন ও অখ্যাত কোম্পানি। বহুল প্রচলিত এসএমসি কোম্পানির ওরস্যালাইনকেও কয়েকটি নি¤œমানের কোম্পানি নকল করে বাজারজাত করেছে । দেখা গেছে, অখ্যাত কোম্পানিগুলোর এমন দৌরাত্মের কারণে মানসম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে বারবার তাদের ওষুধের মোড়ক পরিবর্তন করতে হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাজারি গলির একটি ফার্মেসীর ব্যবস্থাপক বলেন, ‘শুধু ওষুধে কেন, বাংলাদেশের সবকিছুতেই তো ভেজাল। তাছাড়া, যারা নকল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করছে তারা তো প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই করছে। আমরা তো টাকা দিয়ে এসব ওষুধ ক্রয় করি। এ বাংলাদেশে সবই সম্ভব।’
ড্রাগ টেষ্টিং ল্যাবরেটরি সূত্র মতে, নকল,ভেজাল ও মানহীন ওষুধগুলোর মধ্যে রাসায়নিক কোন উপাদান নেই। এসব ওষুধ শুধু ময়দা দিয়ে তৈরি করা হয়। কারখানায় উপযুক্ত পরিবেশ ও যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা না করেই এসব ওষুধ তৈরি করা হয়। এসব ওষুধের মান খুবই নিম্নমানের ও স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর বলে মনে করছেন ওষুধ বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক ডা. অনুপম বড়ুয়া বলেন, একটা ওষুধে প্রয়োজনীয় পরিমাণ উপাদান না থাকলে সেটার কার্যকারিতা থাকে না এবং সেটা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ভেজাল ওষুধ বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’
জানতে চাইলে বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতির চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি সমীর কান্তি সিকদার বলেন, ‘মার্কেটের ৫০০ দোকানের মধ্যে ২০-৫০টি দোকানে ভেজাল ওষুধ বিক্রি হয়। এসব দোকান আমাদের নজরদারিতে রয়েছে। আমরা তাদের আইনের হাতে সোপর্দ করার ভয়ভীতি দেখিয়ে থাকি। কিন্তু আমাদের তো নির্বাহী ক্ষমতা নেই। যে কারণে অনেক সময় আমাদের কিছু করার থাকে না।’