চট্টগ্রামের ফুসফুস সিআরবি যেন মাদকের হাট

সময়টা সন্ধ্যা সাতটা। গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহ শেষে এক প্রাণবন্ত সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত সিআরবি শিরিষ তলার মাঠের কোণায় গোল হয়ে বসে আড্ডায় মগ্ন বেশকিছু যুবক। দূর থেকে চোখে পড়ে পাঁচ-সাত জনের দল আলাদা-আলাদা গোল হয়ে কিংবা এক সারিতে বসে আছে। আড্ডা-গানে, হাসি-আনন্দে মেতে আছে অনেকেই। তবে তাদের বেশির ভাগের হাতেই রয়েছে ছোট ছোট সিগারেট স্বদৃশ্য কিছু বস্তু। দূর থেকে দেখে সিগারেট ভেবে ভুল হতে পারে যে কারও। তবে খানিকটা কাছে যেতেই ভেসে আসে উদ্ভট এক গন্ধ। যারা এই গন্ধের সাথে পরিচিত না তাদের যেন শ^াস নেওয়াটাই দুর্বিসহ হয়ে ওঠে। আর যারা এই গন্ধের সাথে পরিচিত তারা নিমিষেই বুঝতে পারেন আশেপাশে কোথাও চলছে গাঁজার সুখটান। রাত যত বাড়ে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে এসব মাদকসেবীদের সংখ্যা। সিআরবির আনাচে-কানাচে বসে মাদকের আসর, লাগে মাদক বিকিকিনির হিড়িক। এসকল মাদকের মধ্যে রয়েছে মদ, গাঁজা, ইয়াবা, ফেন্সিডিলসহ নানা ধরনের ভয়ঙ্কর নেশা দ্রব্য।

সিআরবি পুলিশ ফাঁড়ির তথ্যমতে, গত ১০ মাসে (এপ্রিল-২০২৩ থেকে জানুয়ারি-২০২৪) সিআরবি ও তার আশেপাশের এলাকা থেকে মোট ৯৫ কেজি গাঁজা উদ্ধার করেছে পুলিশ। যার আনুমানিক বাজার মূল্য ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়াও ৩ হাজার ১৭০ পিস ইয়াবা ও ১ হাজার ৫১০ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করা হয়। গেল ১০ মাসে মাদক ক্রয় ও বিক্রয়ের অপরাধে মোট ৫৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে অনেকেই জামিনে ছাড়া পেয়ে আবারও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েন।

সিআরবি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্র্জ এসআই বোরহান উদ্দিন দৈনিক দেশ বর্তমানকে জানান, গত ১০ মাসে ৩৬টি মাদক মামলায় ৫৩ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যেই অনেকে আবার একাধিক মামলার আসামি। তারা জামিনে ছাড়া পেয়ে আবারও মাদক ব্যবসায় যুক্ত হয়। শুধু মাদক সিন্ডিকেট নয়, মাদকসেবী ও মাদক বিক্রেতাদের সাথে পাল্লা দিয়ে সিআরবিতে বেড়েছে ছিনতাইকারীদের আনাগোনাও।

পুলিশ ফাঁড়ির তথ্যমতে, গত ১০ মাসে ছিনতাই, ডাকাতি ও অস্ত্র মামলায় মোট ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এসব আসামিদের অনেকেই আবার মাদক সেবন ও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত।

প্রশাসনসহ বিভিন্ন অধিদপ্তরের এতো এতো অভিযানের পরও কিভাবে এই জমজমাট মাদক ব্যাবসা চলে তা খতিয়ে দেখার দাবি সচেতন মহলের।

পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে ও বিভিন্ন মামলার নথি থেকে উঠে আসে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীর নাম। তারা সিআরবির বিভিন্ন এলাকায় দাপটের সাথে চালায় তাদের মাদক ব্যবসা। তাদের মধ্যে সিআরবির তুলাতলী বস্তি এলাকার একাধিক মাদক মামলার আসামি শুক্কুর অন্যতম। এছাড়াও উঠে আসে সিআরবির আরেক মাদক সম্রাজ্ঞী ও বহু মামলার আসামি আখলিমার নাম। এর পাশাপাশি সিআরবির অন্যান্য এলাকায় মনা, এরশাদুল, ইয়াসিন, মানিক, আলম, খোকন, শাকিল, মমতাজ, মনি, লাবু, বাবলু, আলতাফ, আরিফসহ বিশাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বসে মাদকের হাট।

এই ব্যাপারে সিআরবি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই বোরহান উদ্দিন দৈনিক দেশে বর্তমানকে বলেন, গত এক বছরে আমরা সিআরবি ও তার আশেপাশের এলাকা থেকে রেকর্ড পরিমাণ মাদক উদ্ধার করেছি। প্রতিনিয়ত মনিটরিং ও অভিযানের ফলে সিআরবি ও তার আশেপাশের এলাকায় ক্রাইম রেট এখন অনেকটাই কমে এসেছে। আমরা মাদক নির্মূলে বদ্ধ পরিকর।

জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম ওবায়দুল হক দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। শুধু সিআরবি এলাকা নয়, কোতোয়ালি থানার প্রতিটা আনাচে কানাচে থাকবে মাদক মুক্ত। এই ব্যাপারে আমরা কাউকেই ছাড় দিচ্ছি না।

তিনি আরও বলেন, ঈদকে ঘিরে আমাদের এই তৎপরতা আরও বেড়েছে। জনগণ যাতে কোনো প্রকার হয়রানির শিকার না হন সে কারণে আমরা বিশেষ টিম চালু করেছি। গত এক মাসেই আমরা কোতোয়ালি জোন থেকে ৬০ থেকে ৭০ জন ছিনতাইকারি আটক করেছি।

দেশ বর্তমান/এআই