ঘুরে দাঁড়াচ্ছে অর্থনীতি

পাঁচ মাস কমার পর মে মাসে রাজস্ব আয়ে রেকর্ড

গত কয়েক মাস ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অস্বস্তির কারণ ছিলো রাজস্ব আহরণ কমে যাওয়া। অর্থবছরের শুরুতে সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতির কারণে আমদানি কমে যাওয়ায় প্রভাব পড়ে রাজস্ব আহরণেও। রাজস্ব আহরণের সে নেতিবাচক ধারা থেকে বেরিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে এনবিআর।  ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় দেশের অর্থনীতি। টানা পাঁচ মাস কমার পর গেল মাসেও রাজস্ব আহরণের পারদ ছিলো উর্দ্ধমুখী। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে মে মাসের আমদানি-রফতানি চিত্র বিশ্লেষণে অর্থনীতির ইতিবাচক চিত্র ফুটে এসেছে।

ডলার সংকট, এলসি জটিলতাসহ বৈশ্বিক নানা আর্থিক সংকটের মধ্যেও বেড়েছে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য। বিধিনিষেধের মাঝেও মে মাসে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ৭ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করেছে। সে হিসেবে চট্টগ্রাম কাস্টমস দিয়ে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ৫৬ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা রাজস্ব এসেছে। তবে চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত টানা পাঁচ মাস রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতা ছিলো।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ’র (চবক) তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে তিন হাজার ৯১৪টি জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে। এসব জাহাজে ১১ মাসে ২৭ লাখ ১৮ হাজার টিইইউএস (টুয়েন্টি ফুট ইকুয়েভিলেন্ট ইউনিট) কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। একই সময়ে বাল্ক (খোলা পণ্য) হ্যান্ডলিং হয়েছে ১০ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন। অবশ্য ২০২১-২০২২ অর্থবছরে জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে চার হাজার ২৩১টি। একই সময়ে ৩২ লাখ কনটেইনার এবং ১১ কোটি ৮১ লাখ মেট্রিক টন পণ্য হ্যান্ডলিং করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। অর্থবছর শেষ হতে আরও এক মাস বাকি। এসময়ে জাহাজ,কনটেইনার ও পণ্য হ্যাল্ডলিংয়ের গতি আরও বাড়বে, আশাবাদ বন্দর কর্তৃপক্ষের।

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে (মে) আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার ৮৮৩ টিইইউস। এর আগের মাসে (এপ্রিল) আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিলো এক লাখ সাত হাজার ৭৫২ টিইইউএস। অর্থাৎ এপ্রিল মাসের তুলনায় মে মাসে নয় হাজার ১৩১ টিইইউস বেশি কনটেইনারবাহী পণ্য আমদানি হয়েছে। এছাড়া মার্চে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয় ৯৮ হাজার ৭৩৬ টিইইউস। মার্চের তুলনায় এপ্রিলে আমদানি বেড়েছিলো নয় হাজার ১৬ টিইইউস। মার্চ ও এপ্রিলের তথ্য পর্যালোচনায় মে মাসে আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে ১৮ হাজার ১৪৭ টিইইউস।

এদিকে এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে দেশের সামগ্রিক রফতানি আয় ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মে মাসে কমেছে রফতানিযোগ্য পণ্যবাহী কনটেইনার হ্যান্ডলিং কমেছে। মে মাসে রফতানিমুখী কনটেইনার হয়েছে ৫০ হাজার ২৭৭ টিইইউস। এপ্রিলে হয়েছে ৫৫ হাজার ৯৪০ টিইইউস এবং মার্চ মাসে রফতানি হয়েছে ৫৫ হাজার ১৬০ টিইইউস।

এ প্রসঙ্গে চবক সচিব মো. ওমর ফারুক দেশ বর্তমানকে বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলার সংকট ও এলসি জটিলতার কারণে বিলাসী পণ্যের আমদানি কমেছে। যার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজের আগমনও হয়েছে কম। তবে মে মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছে বেশি, যার প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের রাজস্ব আহরণে।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আগত আমদানিকৃত পণ্যের ভলিউমের ওপর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব আহরণের পারদ ওঠা-নামা করে। চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য মতে, চলতি ২০২২-২০২৩ অর্থবছর ৭৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। গত মে মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিলো চার হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। আর আদায় হয়েছে সাত হাজার ৮৪০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। শতকরা হিসেবে মে মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬৬.২২ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। ২০২১-২০২২ অর্থবছরের মে মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছিলো পাঁচ হাজার ৯৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের মে মাসে রাজস্ব আদায় বেশি হয়েছে ৫৩.৮৩ শতাংশ।

তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৫৬ হাজার ৫৩০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে ১১ মাসে রাজস্ব আয় হয়েছিলো ৫৩ হাজার ১৫৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্যমতে, গত এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিলো ১.৫২ শতাংশ। মে মাসে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আহরণ হওয়ায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.৫৩ শতাংশ।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার মো. বদরুজ্জামান মুন্সি বলেন, ডলার সংকটের কারণে সরকার আমদানি সীমিত করায় গত কয়েক মাসে আমদানির পরিমাণ কমেছিলো। যার ফলে রাজস্বও কমে। মে মাসে আমদানি বাড়ায় কাস্টমসের রাজস্ব আদায় বেড়েছে। অর্থবছরের শেষ মাসে রাজস্ব আয় আরও বৃদ্ধি পাবে, আশাবাদ এই কর্মকর্তার।

এমএফ