প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ইংল্যান্ডে ১৫০ ভাগ বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। এটা সবার মনে রাখতে হবে। আমরা কিন্তু সেই পর্যায়ে যাইনি। গ্যাস-বিদ্যুৎ দেওয়া যাবে ক্রয়মূল্যে। আর কত ভর্তুকি দেওয়া যায়। আর এ ক্ষেত্রে কেন দেবো। আমরা ভর্তুকি দিচ্ছি কৃষিতে, খাদ্য উৎপাদনে। করোনার সময় তো আমরা বিশেষ প্রণোদনা দিয়েছি।
রোববার (০৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নবনির্মিত (বিডা) ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যে বিদ্যুৎ দেই এটা উৎপাদন করতে ১ কিলোওয়াটে খরচ হয় ১২ টাকা। সেখানে আমরা নিচ্ছি মাত্র ৬ টাকা। তাতেই আমরা অনেক চিৎকার শুনি। ইংল্যান্ডে কিন্তু ১৫০ ভাগ বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। এটা সবার মনে রাখতে হবে। আমরা কিন্তু এখনো সে পর্যায়ে যাইনি।’
‘আমি আবারও বলবো, গ্যাস-বিদ্যুৎ সাপ্লাই দেওয়া যাবে যদি ক্রয়মূল্য যা হয় সেটা সবাই দিতে রাজি থাকে। তাছাড়া কত ভর্তুকি দেওয়া যায়! আর এ ক্ষেত্রে কেন ভর্তুকি দেবো? ভর্তুকি দিচ্ছি আমরা কৃষিতে, খাদ্য উৎপাদনে। আমরা করোনাভাইরাস যখন মোকাবিলা করি, আমরা বিশেষ প্রণোদনা দেই যাতে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প কল-কারখানা চালু থাকে। এই প্রণোদনা দেওয়ার ফলেই কিন্তু আমাদের অর্থনীতির গতিটা সচল থাকে। প্রতিকূল অবস্থা অতিক্রম করেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এটা মাথায় রাখতে হবে—বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা। আজকে সেই অবস্থায় আমাদের চলতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুতের জন্য যে হাহাকার, জেনারেটারে যে ট্যাক্স ছিল, সেটা আমি প্রত্যাহার করে নিয়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুদ্র বিদ্যুৎকেন্দ্র, কল-কারখানা; আপনারাও যাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেন, ১০ মেগাওয়াট থেকে ৩০ মেগাওয়াট সে ব্যবস্থাও আমি করেছিলাম। শুধু তাই না, আপনারা নিজেরা উৎপাদন করে নিজেরা ব্যবহার করবেন, আবার অন্যকে দিতে পারবেন। অর্থাৎ ব্যবসা-বাণিজ্য যাতে ভালোভাবে চলে, বিনিয়োগ আসে সেই চেষ্টাই আমরা করি। তবে আজকে (বিদ্যুৎ) আমরা শতভাগ দিতে পেরেছি।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখন ৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। স্বাধীনতার পরে এটা অনেকে ভাবতেই পারেনি যে বাংলাদেশ এখানে আসতে পারে। এটা মাথায় রাখতে হবে, মাত্র ১৪ বছরে কিন্তু আমরা এ অর্জন সম্ভব করেছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতি অত্যাধিক বেড়ে যাওয়ায় ‘আমাদেরকেও যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে। তবুও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। এর মধ্যেও আমাদের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। আমাদের সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা সহজ হয়ে যায়। আজকে কিন্তু গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত মানুষের উন্নতি হচ্ছে এবং আমাদের দেশীয় উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। নিজেদের বাজার আমরা সৃষ্টি করতে সক্ষম হচ্ছি।’
এসময় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিদেশি বিনিয়োগ চাই। সেই সঙ্গে সঙ্গে আমি চাই আমাদের দেশে যুব সমাজ নিজেরাই বিনিয়োগকারী হবে। উদ্যোক্ত গড়ে তোলা। আমরা ফার্স্ট ট্র্যাক অনট্রোপ্রেনারশিপ গড়ে তোলার ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমাদের যুব সমাজের জন্য স্টার্টআপ প্রোগ্রাম আমরা করে দিয়েছি। তার জন্য আলাদা বাজেটও আছে। কোম্পানি আইন পরিবর্তন করে এক ব্যক্তি কোম্পানি করতে পারে সেই ব্যবস্থাটাও নিয়েছি। যাতে করে আমাদের নিজেদের ছেলেপেলেরা উঠে আসবে, কাজ করবে, সেগুলো চাচ্ছি।’
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নিশ্চয়ই আপনারা এটা স্মরণ করবেন, গত ১৪ বছরে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ আমরা সৃষ্টি করেছি। শান্তিপূর্ণভাবে আপনারা ব্যবসা করেন। এখন আর হাওয়া ভবনের পাওনা দিতে হয় না। কোনো কিছুই করতে হয় না। সবাই বিনিয়োগ করুন। নিজেরাও লাভবান হবেন আবার আমার দেশটাও লাভবান হবে। নতুন নতুন পণ্য ও বাজার বের করতে হবে। কাজেই বিদেশি-দেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে আমাদের দেশ আরও উন্নত হোক, ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা চাই বাংলাদেশ উন্নত-সমৃদ্ধ হবে।’
এরআগে রোববার সকালে বিডা ভবন উদ্বোধন শেষে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে মোনাজাতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। আগারগাঁওয়ে স্থাপিত বিডার প্রধান কার্যালয় হিসেবে নবনির্মিত ভবনটি সরকার নামকরণ করেছে ‘বিনিয়োগ ভবন নামে। পরে নবনির্মিত বিডা ভবনটি পরিদর্শন করে এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর গতিশীল নেতৃত্বে অর্থনীতির চিত্র পাল্টে গেছে। বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। করোনভাইরাস মহামারি ও পরবর্তী সময়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অগ্রগামী হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রীর যথাযথ পরিকল্পনায় এসব উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. চৌধুরী নাফিজ সরাফাতসহ বেসরকারি খাতের অনেক উদ্যোক্তা।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে এক একর জমির ওপর ১৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২ তলা বিশিষ্ট বিডা ভবন নির্মাণ করা হলো।