খান পরিবারের সদস্য তামিমের বিদায়ে চট্টগ্রামে হতাশা

চট্টগ্রামের খান পরিবার। দীর্ঘ বছর যাবৎ দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে যে পরিবারটি সমৃদ্ধ করেছে। ক্রীড়ায় দেশকে সাফল্যে শিখরে নিয়ে যেতে এই পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের বুকে চট্টগ্রামকে আলোকিত করেছে এই পরিবারের একঝাঁক উজ্জ্বল তারকা। সেই পরিবারের গর্বিত সন্তান বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবাল।

দেশের ক্রীড়াঙ্গনে যাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে হয় না। গত ৫ জুলাই রাতে তামিম যখন পরদিন সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের ঘোষণা দেন, তখনই একটা গুঞ্জন শুরু হয়ে যায় যে, ওয়ানডে’র অধিনায়কের পথ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন তামিম ইকবাল। কিন্তু, তিনি একি করলেন! সারাদেশকে বিস্ময়ের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে সবধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষনা দেন তামিম ইকবাল। অসময়ে তার এই আকস্মিক বিদায়ে অবাক দেশের ক্রিকেট প্রিয় দর্শক। হতাশা নেমে আসে চট্টগ্রামেও। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশও করেছেন।

৫ জুলাই বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে আফগানদের কাছে প্রথম ওয়ানডেতে হারের পর সিরিজ কাভার করতে চট্টগ্রামে যাওয়া সাংবাদিকদের কাছে মধ্যরাতে একটি ক্ষুদে বার্তা পাঠান তামিম। যেখানে জানান, ৬ জুলাই দুপুর ১২টায় সংবাদ সম্মেলন করে কিছু বিষয়ে জানাবেন তিনি। পরে সময় পরিবর্তন করে দেড়টায় সংবাদ সম্মেলন করার কথা জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনের ভেন্যু হোটেল টাওয়ার ইন-এর বাইরে দুপুরের আগে থেকে জটলা বাড়ছিল ক্রিকেটপ্রেমীদের। নির্ধারিত সময়ে হাজির হন তামিম ইকবাল। বিমর্ষ অবস্থায় থাকা তামিমের মুখ দিয়ে যেন তখন কথা বেরোচ্ছিল না। কান্নার জন্য ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলেন না তিনি। এর মধ্যেই বাকরুদ্ধ কন্ঠে জানালেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত। তারপরই নিজের প্রয়াত বাবাকে স্মরণ করে তামিম বলেন, ‘আমি সবসময় বলেছি, ক্রিকেটটা আমার বাবার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য। আমি জানি না, তাকে কতটুকু গর্বিত করতে পেরেছি। সেটার জন্য ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গড়েছি।’

তামিম ইকবালের বাবা ছিলেন ইকবাল খান। চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনের উজ্জ্বল এক নক্ষত্র। কি ফুটবল, কি ক্রিকেট দুটোতেই ছিলেন সমান পারদর্শী। স্বাধীনতার পর চট্টগ্রামের ক্রিকেট লিগে স্টার ক্লাবের হয়ে প্রথম সেঞ্চুরি রেকর্ড রয়েছে ইকবাল খানের দখলে। ফুটবলে ছিলেন স্ট্রাইকার। চট্টগ্রাম লিগে মোহামেডানের হয়ে খেলে অনেক শিরোপা জয়ে তার ভুমিকা ছিল ঈর্ষনীয়। জেলা দলের হয়ে থাইল্যান্ডের রাজবীথি এবং শ্রীলংকা একটি ক্লাব দলের বিরুদ্ধে মধ্যমাঠ থেকে তাঁর সেই গোলের দৃশ্য এখনো অনেকে মনে রেখেছেন। ইকবাল খানের স্ত্রী নুসরাত ইকবাল খানও একজন সংগঠক হিসেবে চট্টগ্রাম জেলা ও বিভাগীয় মহিলা ক্রীড়া সংস্থা’র সাথে জড়িত ছিলেন।

ইকবাল খানের আরো ৩/৪ ভাই, কামাল, আজম ও আফজল চট্টগ্রাম লিগে দাপটের সাথে ফুটবল খেলেছেন বিভিন্ন দলের হয়ে। তবে আরেক ভাই আকরাম খান, ছাড়িয়ে গেছেন সবাইকে। তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেটের অবিচ্ছেদ্দ এক অংশ। জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন। তার হাত ধরেই আইসিসি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। ১৯৯৭ সালের ১৩ এপিল মালয়েশিয়ার কিলাত ক্লাব মাঠে অনুষ্ঠিত ফাইনালে বাংলাদেশ ২ উইকেটে কেনিয়াকে হারিয়েছিল।

সেই সময়ে চট্টগ্রামের কাজির দেউরির ইকবাল খানের বাসায় যেন উচ্ছ¡াসের জোয়ার বইয়ে গিয়েছিল। সর্বত্র ছিল খুশির ফোয়ারা। মিষ্টি বিতরণের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। কেননা, সেই বাড়ির-ই ছেলে আকরাম খান। জাতীয় দলে বেশ কয়েক বছর খেলার পর আকরাম খান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাথে যুক্ত হন এবং বিভিন্ন পদে থেকে বর্তমানে ক্রিকেট ম্যানেজার (অপারেশন) হিসেবে যুক্ত আছেন।

ইকবাল খানের বড় ছেলে নাফিস ইকবাল বাবা-চাচার পদাংক অনুসরণ করে ক্রিকেট আসেন এবং জাতীয় দলেও খেলেছেন। বাংলাদেশের প্রথম (জিম্বাবয়ের বিরুদ্ধে) জয় পাওয়া দলে নাফিস ইকবাল ওপেনার হিসেবে খেলেছেন। খেলাটি ২০০৬ সালে চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বেশ কয়েক বছর জাতীয় দলে খেলার পর বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ম্যানেজার হিসেবে জড়িত রয়েছেন।

সেই পরিবারের ছেলে তামিম ইকবাল খান। যার রক্ত ও শিরা উপশিরায় ঢুকে আছে ক্রিকেট আর ক্রিকেট। ছোটকাল থেকে ক্রিকেটের প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ আর পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় তিনিও ক্রিকেটার হয়ে ওঠেন। শুধু কি তাই, তামিম ইকবাল নিজেকে নিয়ে গেছেন ক্রিকেটের সর্বোচ্চ শিখরে। সবধরণের ফরমেটে তিনি দেশের সেরা ক্রিকেটার হিসেবে ক্রীড়ামোদী মহলের ঠাই করে নিতে সক্ষম হন। দেশের গন্ডি পেরিয়ে ক্রিকেটে মক্কা খ্যাত লর্ডসে সেঞ্চুরি হাকিয়ে অনার বোর্র্ডে একমাত্র বাংলাদেশী হিসেবে নাম লিখিয়েছেন।

সেই ক্রিকেটার আজ একদিনের ব্যাবধানে হয়ে গেলেন সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার। দেশের ৯০ শতাংশ ক্রিকেটপ্রেমী বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না। কেউ কেউ, ভেতরের খবর খুজে বের করার চেষ্টা করছেন। এটা কি, ‘তামিম ইকবালের নিজের সিদ্ধান্ত, নাকি তাকে বাধ্য করা হয়েছে’- এমন কথাও বলছেন, কেউ কেউ। তবে অনেকেই এও বলছেন যে, এটা তার সঠিক সিদ্ধান্ত। ফর্ম থাকতে থাকতেই বিদায় নিয়েছেন। শুধু তামিম ইকবাল নন। বিশ্বসেরা অনেকে ক্রিকেটার যেমন, ব্রায়ান লারা, শচীন টেনডুলকার, মুরালীধরণ, মাশরাফি বিন মর্তুজাসহ আরো অনেকেই তামিম ইকবালের মতোই ক্রিকেটকে বিদায় জানান।