চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ থানার ওসি মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন ও এএসআই আব্দুল আজিজের ‘খোঁজ’ পাচ্ছে না সিআইডি। এই দুই পুলিশ কর্মকর্তা গত ৪০ দিন ধরে নিরুদ্দেশ রয়েছেন। কিডনি রোগী মায়ের ডায়ালাইসিস ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদ করতে গিয়ে গ্রেপ্তার যুবককে থানায় নির্যাতনের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে গত ২০ ফেব্রুয়ারি আদালতে নালিশি মামলা দায়ের হয়।
মামলা দায়েরের পরদিন (২১ ফেব্রুয়ারি) অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ছুটিতে যান এই দুই পুলিশ কর্মকর্তা। এরপর থেকে তারা আর থানায় আসেননি। এক মাসের বেশি সময় ওসি ছাড়াই চলছে থানার কার্যক্রম। এতে থানায় সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে গত ১০ জানুয়ারি বিক্ষোভ করেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। ওই দিন বিক্ষোভকারীরা হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনের সড়ক অবরোধ করেন। এ দিন পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আন্দোলনকারীদের সড়ক ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু আন্দোলনকারীরা সড়ক না ছাড়ার ঘোষণা দেন। বাকবিতন্ডতার একপর্যায়ে পাঁচলাইশ থানার ওসি নাজিম উদ্দিন নিজের মোবাইল ফোনে বিক্ষোভকারীদের ভিডিও ধারণ করেন। এ সময় সৈয়দ মোহাম্মদ মোস্তাকিম নামের এক বিক্ষোভকারী ওসির মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় হাতাহাতিতে ওসির মোবাইল মাটিতে পড়ে ভেঙে যায়। এরপর ওসি মোস্তাকিমকে মারধর করেন। পুলিশ মোস্তাকিমকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
ওসির মারমুখী আচরণের ফুটেজ অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর ওই দিন রাতে সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচলাইশ থানার এসআই মোস্তাফিজুর রহমান বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। এতে আসামি করা হয় মোস্তাকিমকে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হামলা ও কর্তব্য কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মোস্তাকিমকে ১১ জানুয়ারি আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। এরপর ১৫ জানুয়ারি তাকে জামিন দেন আদালত। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগে ২০ ফেব্রুয়ারি আদালতে নালিশি মামলা করেন মোস্তাকিম।
আদালত মামলাটি সিআইডির পুলিশ সুপারকে (এসপি) তদন্তের আদেশ দেন। কিন্তু সিআইডি এখনো পর্যন্ত আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেননি।
গত ৭ মার্চ সিআইডি আদালতকে জানিয়েছে, ২২ ফেব্রুয়ারি মামলার বিবাদী পাঁচলাইশ থানার ওসি মো. নাজিম উদ্দিন ও এএসআই আব্দুল আজিজকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়। কিন্তু দুই পুলিশ কর্মকর্তা নোটিশের কোনো জবাব দেননি। থানা থেকে নোটিশ দুটি সিআইডিতে ফেরত আসে।
জানা গেছে, রোববার (০৩ এপ্রিল) চট্টগ্রাম জেলা-মেট্রো ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসপি) শাহনেওয়াজ খালেদ দ্বিতীয়বারের মতো ওসি ও এএসআইকে নোটিশ পাঠিয়েছেন।
জানতে চাইলে এসপি শাহনেওয়াজ খালেদ বলেন, ‘ওসি ও এএসআই কোথায় আছেন তা জানি না। তাদেরকে দ্বিতীয়বারের মতো কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছি।’
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দুই পুলিশ কর্মকর্তা নোটিশের জবাব না দিলে তাদের বিরুদ্ধে আদালত ব্যবস্থা নেবেন। তবে আমি মামলার সাক্ষীদের বক্তব্য নিয়েছি। ঘটনাটি আরও তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেবো।’ কিন্তু ওসি মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন ও এএসআই আব্দুল আজিজ গত ৪০ দিন ধরে কোথায় আছেন?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুই পুলিশ কর্মকর্তা অসুস্থতার অজুহাতে থানায় আসছেন না।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উত্তর জোনের উপকমিশনার (ডিসি) মোখলেছুর রহমান দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘পাঁচলাইশ থানার ওসি নাজিম ও এএসআই আবদুল আজিজ অসুস্থতার কারণে ছুটিতে রয়েছেন। তারা কবে কর্মস্থলে ফিরবেন তা জানি না।’
ওসি নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এএসআই আবদুল আজিজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘আমার কোমরে ব্যথা। হাসপাতালে ভর্তি আছি। সুস্থ হলে কর্মস্থলে যোগ দেবো।’ কোন্ হাসপাতালে ভর্তি আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঢাকার একটি বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তি আছি।’
এ মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী জিয়া আহসান হাবীব দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘থানায় মামলা দায়েরের সঙ্গে সঙ্গে আসামিদের গ্রেপ্তার করার নিয়ম রয়েছে। কিংবা আসামিকে স্বেচ্ছায় আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হয়। আসামি যদি সরকারি কর্মকর্তা হন তাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে হয়। তবে ওসি নাজিম এবং এএসআই আজিজকে গ্রেপ্তার করেনি সিআইডি। তারা কেউ আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি এবং কাউকে বরখাস্তও করা হয়নি।’