টাঙ্গাইলের যুবক আনিছুর রহমান। ২০১৯ সালে অভাবের তাড়নায় একটি চক্রের পাল্লায় পড়ে ভারতে গিয়েছিলেন নিজের একটি কিডনি বিক্রি করতে। সেখানে গিয়ে তিনি শিকার হন চরম প্রতারণার। প্রতারক চক্র কিডনি গ্রহীতার নিকট থেকে বিশাল অংকের টাকা নিলেও আনিছুরকে দেন মাত্র অল্প টাকা।
এতে তার মাঝে চরম ক্ষোভের জন্ম নিলেও কিছুই করার ছিলনা। এই ক্ষোভ-হতাশা থেকেই তার মাথায় একটি বিষয় আসে, সেটি হলো ব্যবসা হিসাবে তো এটি মন্দ নয়। যেমন ভাবা, তেমন কাজ। এর পর নিজেই গড়ে তোলেন কিডনি বেচা-কেনার একটি চক্র।
জানা গেছে, সাধারণত কিডনি রোগে আক্রান্তরা ডায়ালাইসিসসহ বিভিন্ন চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। যাদের দু’টি কিডনিই বিকল হয়ে যায়, কেবল তারাই প্রতিস্থাপনের প্রয়াস নেন। এ ক্ষেত্রে রোগী উচ্চবিত্ত শ্রেণির না হলে সেটি সম্ভব হয়না।
কারণ পুরো ব্যাপারটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাও আবার কিডনি সহজে মিলেনা। এই বিষয়টিকেই কাজে লাগিয়েছে বিভিন্ন চক্র। তার নাম ঠিকানা বের করে বিত্তবান কিডনি গ্রহীতার সাথে যোগাযোগ করে। র্যাব জানায়, তাদের নিকট থেকে কিডনি প্রতি ৫০ লাখ টাকা চুক্তি করলেও ভুক্তভোগী দাতাকে দেওয়া হতো মাত্র পাঁচ লাখ টাকা। বাকি টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিত চক্রটি। এভাবে তারা অবৈধ উপায়ে অর্ধশতাধিক দরিদ্র ব্যক্তির কাছ থেকে কিডনি নিয়েছে।
গত বুধবার (১৯ জুলাই) রাজধানীর ভাটারা, বাড্ডা, বনানী ও মহাখালী এলাকা থেকে এমন এক চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-১। গ্রেপ্তাররা হলেন– চক্রের মূলহোতা আনিছুর রহমান ও তার চার সহযোগী আরিফুল ইসলাম রাজিব, সালাউদ্দিন তুহিন, সাইফুল ইসলাম ও এনামুল হোসেন। তাদের কাছ থেকে অঙ্গিকারনামা ও ভুক্তভোগীর সঙ্গে করা চুক্তির এফিডেভিট কপিও উদ্ধার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ( ২০ জুলাই) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
র্যাব-১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মোস্তাক আহমেদ বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে টার্গেট করে প্রতারণার ফাঁদ পাতে চক্রের সদস্যরা। কখনও তারা বলে সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে একটির বেশি কিডনি দরকার নেই। কখনও মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে চিকিৎসার খরচ দেওয়ার কথা বলে পার্শ্ববর্তী দেশে নিয়ে যেত। অসহায় মানুষগুলো টাকার লোভে কিডনি হারিয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে।
র্যাব অধিনায়ক বলেন, ২০১৯ সালে চিকিৎসার জন্য ভুয়া কাগজপত্রে ভারতে গিয়ে প্রতারিত হন টাঙ্গাইলের আনিছুর। অর্থের বিনিময়ে নিজের একটি কিডনি বিক্রি করেন। তবে সেখানে কিডনি প্রতিস্থাপনের রোগীদের ব্যাপক চাহিদা দেখে প্রলুব্ধ হন তিনি। পরে দেশে ফিরে নিজেই কিডনি বেচাকেনার অবৈধ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। সেখানে ভারতে অবস্থানরত কিডনি কেনাবেচা চক্রের সহযোগিতায় একটি দালাল চক্র গড়ে তোলেন। তারা অনলাইনে বিত্তশালী কিডনি রোগী এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে কিডনি ডোনার সংগ্রহ করে বৈধ ও অবৈধভাবে বিমানে বা স্থলপথে ভারতে পাঠাতেন।
কর্নেল মোস্তাক আহমেদ আরো বলেন, জীবন বাঁচাতে কিডনি ক্রেতারা ৪৫-৫০ লাখ টাকা খরচ করেন। এই টাকার থেকে চার পাঁচ লাখ টাকা পান ডোনার। আর দেশের অভ্যন্তরে সক্রিয় দালাল, অসাধু ট্রাভেল এজেন্টসহ চক্রের অন্যান্য সদস্যরা ৫-১০ লাখ টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন। বাকি প্রায় ৩০ লাখ টাকা বিদেশে অবস্থানরত কিডনি পাচার সিন্ডিকেটের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। ‘চক্রটি চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে কাজ করে। প্রথম গ্রুপ বিদেশে অবস্থান করে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন প্রয়োজন এমন বিত্তশালী রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করত। দ্বিতীয় গ্রুপ দেশে থাকা মূলহোতা আনিছ ঢাকায় বসে বিদেশে ডোনার পাঠানোর বিষয় তদারকি করে।’
র্যাব অধিনায়ক বলেন, চক্রের তৃতীয় দলটির সদস্য আরিফ এবং তুহিন প্রথম দলের চাহিদা মোতাবেক দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিব ও অভাবী মানুষদের চিহ্নিত করে এবং তাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অর্থের বিনিময়ে কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশনের জন্য ডোনার হতে প্রলুব্ধ করে নিয়ে আসতেন। চতুর্থ গ্রুপটির হোতা ‘সাহেবানা ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস’ এর মালিক সাইফুল ইসলাম ভুক্তভোগী কিডনি ডোনারদের পাসপোর্ট, ভিসা প্রসেসিংসহ ভুয়া কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন।
এখানে উল্লেখ্য, সম্প্রতি সরকারি একটি স্বনামধন্য হাসপাতালে দেশের প্রথম কিডনি প্রতিস্থাপনে প্রতারণার বিষয়টি গণমাধ্যমে এসেছে। এ প্রতারণার সঙ্গে এই চক্রটির যোগসূত্র রয়েছে কিনা সে প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তাদের জড়িত থাকার কোনো তথ্য-প্রমাণ পায়নি।