কালুরঘাট সেতু: কেউ কথা রাখে নি

২ জন এমপি’র জীবন গেল, তবুও কালুরঘাট সেতু হলো না

একদিকে শহর, আরেক দিকে শহরতলির উপজেলা বোয়ালখালী।  মাঝখানে বয়ে গেছে কর্ণফুলী নদী।  শহর আর শহরতলির মানুষকে এক সুতোর বন্ধনে আবদ্ধ করেছে কালুরঘাট সেতু।  ‘দক্ষিণ চট্টগ্রামের দুঃখ’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া কালুরঘাট সেতুটি জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে প্রায় আড়াই দশক ধরে।  চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মঈনুদ্দিন খান বাদল এই সেতু নিয়ে জাতীয় সংসদে বিভিন্ন সময় বক্তব্য দিয়ে ক্ষোভ-আক্ষেপের কথা জানিয়েছিলেন।  এমনকি সেতু নির্মাণ না করলে তিনি সংসদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণাও দিয়েছিলেন।  ২০১৯ সালে বাদলের মৃত্যুর পর সেতু নিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর স্বপ্নভঙ্গ হয়।
২০২০ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীকে সেতু নিয়ে আবার স্বপ্ন দেখান মোছলেম উদ্দিন আহমদ।  নির্বাচিত হওয়ার এক বছরের মধ্যে সেতুর নির্মাণ কাজ শুরুর প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন এই আওয়ামী লীগ নেতা।  তিনিও সংসদে এই সেতু নিয়ে কম কথা বলেননি।  গত দুই বছরে রেলমন্ত্রীর সঙ্গে সেতু নিয়ে দফায় দফায় বৈঠকও করেছিলেন তিনি। গত ৬ ফেব্রুয়ারি এই সংসদ সদস্যও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। চার বছরের মধ্যে দুই সংসদ সদস্যের জীবন চলে গেলো, তবুও দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর কালুরঘাট সেতুর স্বপ্ন পূরণ হয়নি।

নগরীর সাথে বোয়ালখালী উপজেলার সংযোগ স্থাপনকারী ৬৩৮ মিটার দীর্ঘ কালুরঘাট সেতুটি ৯৩ বছরের পুরনো।  বোয়ালখালী ও পটিয়ার তিন ইউনিয়নের প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই সেতুর ওপর সরাসরি নির্ভরশীল।  এ ছাড়া দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন রুটের গাড়িও এই সেতু দিয়ে বিভিন্ন সময় চলাচল করে।
১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে দ্বিতীয় কর্ণফুলী সেতু ভেঙে গেলে কালুরঘাট সেতু হয়ে পড়ে নগরীর সাথে দক্ষিণ চট্টগ্রামের ছয়টি উপজেলা ও কক্সবাজার, বান্দরবান জেলার যোগাযোগের অন্যতম রাস্তা।  কিন্তু ভারি যান চলাচলের কারণে সেতুটি নাজুক হয়ে পড়ে।  মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় রেলওয়ে সেতুটিকে ২০০১ সালে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে।  এরপর ২০১১ সালে চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) একদল গবেষকও সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেন।  ২০০৪ সালের ১৩ আগস্ট ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সেতুতে বড় ধরনের সংস্কার কাজ করা হয়।  এ সময় ১১ মাস সেতুর ওপর যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল।

মূলত এ সেতু বারবার সংস্কার-মেরামত করে জোড়াতালি দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।  বিভিন্ন সময়ে সংস্কার কাজ করা হলেও সেতুটির অবস্থা এখন খুবই নাজুক। সেতুটি এখন ভরে আছে নানা খানাখন্দে।  সেতুর ২৯টি স্থানে রেলিংয়ের নিচে প্রায় ১৯৮ ফুট কাঠের পাটাতন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।  সেতুর পূর্বপাশে দুটি সাইনবোর্ড দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।  একটিতে লেখা ‘১০ টনের অধিক মালামাল পরিবহন নিষেধ।’  অপরটিতে লেখা, ‘এই সেতুর ওপর দিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচল নিষেধ।’
এসব বিধিনিষেধ কিছুই মানা হচ্ছে না।  ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষ যেমন পারাপার করে, তেমনি কয়েক হাজার যানবাহন ও কয়েক জোড়া ট্রেনও চলছে।  সেতুর মাঝপথে গাড়ি বিকল হয়ে গেলে অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হয়।

জানা গেছে, এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ৫০ হাজার লোক পারাপার হয়।  প্রতিদিন চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারি রুটে চলাচল করে দুই জোড়া ট্রেন।  সেতুটির ওপর দিয়ে ট্রেনের পাশাপাশি দক্ষিণ চট্টগ্রামের বোয়ালখালী ও পটিয়াগামী গাড়ি চলে।  চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগ চালু হলে তারও পথ হবে এই সেতু।  কিন্তু সংকীর্ণ এই সেতু দিয়ে এখন একসঙ্গে দুই দিকে যানবাহন চলাচল করতে দেওয়া হয় না।  এক দিকের যানবাহন আটকে রেখে অন্যপাশের গাড়ি ছাড়া হয়।  একমুখী যান চলাচলের কারণে সব সময় যানজট লেগে থাকে।  চট্টগ্রাম শহর থেকে বোয়ালখালী উপজেলায় পৌঁছাতে যেখানে সময় লাগার কথা ৩০ থেকে ৪০ মিনিট, সেখানে একমুখী এ সেতু দিয়ে চলাচলে সময় লাগছে তিন থেকে চার ঘণ্টা।
জানা গেছে, সেতুর পূর্ব পাড়ে বোয়ালখালী অংশে প্রায় ৫০টি কলকারখানা রয়েছে। সেতু নড়বড়ে হওয়ায় এসব কারখানা পণ্য পরিবহন করতে পারে না। তারা তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু (শাহ আমানত সেতু) ব্যবহার করে।

জানা গেছে, ১৯৯৬ সাল থেকে কালুরঘাটে নতুন সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন বোয়ালখালীবাসী।  ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কালুরঘাটে রেলওয়ে সেতুর পাশে রেল কাম সড়ক সেতু নির্মাণের জন্য দাবি জানানো হয়েছিল।  দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এই দাবি জানানো হয়।  কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এসে কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।  কিন্তু তৎকালীন সরকার প্রবল আপত্তি উপেক্ষা করে কালুরঘাটের বদলে তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু নির্মাণ করে।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর কালুরঘাটে নতুন সেতুর দাবি আরও জোরালো হয়।  বোয়ালখালীর সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের দাবির মুখে সরকার শেষ পর্যন্ত কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।  কিন্তু দফায় দফায় নকশা পরিবর্তনের কারণে সেতুটির নির্মাণ কাজ এখনো পর্যন্ত শুরু হয়নি।
সর্বশেষ গত বছরের আগস্টে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান সেতুটির তৃতীয় দফায় নকশা তৈরি করে।  এতে সম্মতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।  এর আগে দুবার সেতুটির নকশা পরিবর্তন করা হয়েছিল।  দ্বিতীয় নকশা অনুযায়ী, কালুরঘাট সেতুর ওপরতলা দিয়ে গাড়ি চলার কথা ছিল।  নিচতলা দিয়ে চলার কথা ছিল ট্রেন।

এখন পরিবর্তিত নকশা অনুযায়ী, সড়ক ও রেলের জন্য চার লেনের সেতু হবে।  একপাশে থাকবে ট্রেন আসা-যাওয়ার দুটি পথ এবং অপর দুটি পথ থাকবে গাড়ি আসা-যাওয়ার জন্য।  নকশা পরিবর্তনের কারণে সেতুটির নির্মাণ ব্যয় হতে পারে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।  এর আগে প্রথম নকশায় সেতুর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ১৫১ কোটি টাকা।  দ্বিতীয় নকশায় ৬ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেতুটির এখন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ শুরু হবে।  তারপর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদার নিয়োগ করা হবে।  এগুলো শেষ করতে ২০২৩ সালের পুরো সময় লাগতে পারে।  কালুরঘাট সেতু নির্মাণ সংক্রান্ত ফোকাল পারসন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (সেতু) মো. গোলাম মোস্তফা জানান, প্রস্তাবিত নকশায় সেতুর মোট দৈর্ঘ্য হবে ৭৮০ মিটার।  নদীর বাইরে স্থলপথ থাকবে ৫ দশমিক ৬২ কিলোমিটার। প্রতিটি স্প্যানের দৈর্ঘ্য হবে ১০০ মিটার।  মোট পিলার থাকবে আটটি।  সেতুর উচ্চতা হবে ১২ দশমিক ২ মিটার।  সেতুটির প্রস্থ হবে প্রায় ৬৫ ফুট।  তিনি জানান, নতুন নকশার প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি বা শেষ দিকে সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান গোলাম মোস্তফা।  সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হতে অন্তত তিন বছর লাগবে।

কালুরঘাটে নতুন সেতুর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছে ‘বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদ’।  মিছিল সমাবেশ মানববন্ধনের মত কর্মসূচিও তারা পালন করেছে বিভিন্ন সময়ে।
পরিষদের আহবায়ক মো. আব্দুল মোমিন বলেন, ‘১৯৯১ সাল থেকে গত ৩২ বছরে সরকারের পর সরকার দেখলাম, সবাই শুধু আশ্বাস দিয়ে গেল, কেউ কথা রাখলো না।  আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৪ বছরের মেয়াদে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেলসহ তাক লাগানো বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছে।  কিন্তু কালুরঘাটে নতুন একটি চার লেইনের সেতুর দাবি পূরণ হয়নি।  হাজার হাজার মানুষের নিত্যদিনের দুর্ভোগ, ভোগান্তি, অনেকের প্রাণহানি কিছুই যেন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের চোখে পড়ছে না।  কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন নেয়া হচ্ছে, কিন্তু জরাজীর্ণ কালুরঘাট সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন যাবে কীভাবে?’

বোয়ালখালীর কধুরখীলের বাসিন্দা বশর আহমেদ বলেন, ‘দুই এমপি মইন উদ্দীন খান বাদল ও মোছলেম উদ্দিন আহমদ এ সেতু নির্মাণের জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন।  কিন্তু দুই এমপির মৃত্যুতে এ সেতুর প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।  এখন নতুন কেউ এমপি হলেও আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতার কারণে এই সেতু বাস্তবায়ন হওয়া নিয়ে আমরা সন্দিহান।’

উল্লেখ্য, প্রাচীনকাল হতে নদী পারাপারের জন্য কালুরঘাট নামক স্থানটি ভূমিকা রেখে আসলেও ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে এ রেল সেতুটি নির্মিত হয়।  বৃটিশ আমলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বার্মা ফ্রন্টে সৈন্য আনা নেয়ার সুবিধার জন্য ১৯৩০ সালে কালুরঘাট রেল সেতুটি নির্মাণ করা হয়। ব্রুনিক এন্ড কোম্পানী ব্রিজ বিল্ডার্স হাওড়া’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান সেতুটি নির্মাণ করে।  মূলত ট্রেন চলাচলের জন্য ৭০০ গজ দীর্ঘ সেতুটি সে বছর ৪ জুন উদ্বোধন করা হয়।  পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পুনরায় বার্মা ফ্রন্টের যুদ্ধে মোটরযান চলাচলের জন্য সেতুটিতে ডেক (পাটাতন) বসানো হয়।  দেশ বিভাগের পর ডেক তুলে ফেলা হয়।  পরে ১৯৫৮ সালে সব ধরনের যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার।