কালুরঘাটে ফেরিঘাট নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ

যেনতেনভাবে নির্মাণ, জোয়ারের সময় ডুবে থাকে পানিতে

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর উপর অবস্থিত শত বছরের পুরনো কালুরঘাট সেতু। চট্টগ্রাম শহর থেকে বোয়ালখালী উপজেলা এবং পটিয়া উপজেলার তিন ইউনিয়নের মানুষের চলাচলের জন্য এটিই একমাত্র সেতু। এছাড়া দক্ষিণ চট্টগ্রামমুখী ট্রেন চলাচলের জন্যও সেতুটি একমাত্র ভরসা। দীর্ঘদিন থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রাম তথা বোয়ালখালী ও পটিয়াবাসীবাসীর প্রাণের দাবি ছিল, কালুরঘাট সেতুর সংস্কার কিংবা পুনঃনির্মাণ।

চলতি মাসে কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচলের উদ্বোধনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সেতুর ট্রেন লাইনসহ পাটাতন মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। চলাচলের জন্য সেতুর নিচ দিয়ে ব্যবস্থা করা হয় তিনটি ফেরির। নির্মাণ করা হয় ফেরিঘাট। এবার সেই ফেরিঘাট নির্মাণে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রাণালয়ে সচিব বরাবর অভিযোগ করেন আইনজীবী সেলিম চৌধুরী। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় আইনজীবীকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি। এদিকে, খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য নোমান আল মাহমুদ।

মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে করা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রাণালয়ের সচিব বরাবর অভিযোগটির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন চট্টগ্রামের পরিচালক, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী বরাবরও পাঠান অ্যাডভোকেট সেলিম চৌধুরী।

জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট সেলিম চৌধুরী দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, ৪ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নদীর দুই পাশে করা ফেরিঘাটগুলোতে পারপার হতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন যাতায়াতকারীরা। কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে যেনতেন ফেরিঘাট নির্মাণের ফলে নদীতে জোয়ারের সময় ফেরি ঘাটে ভিড়লে ডুবে থাকা ঘাটে কোমর সমান পানি পেরিয়ে ভিজে উঠতে হয়। অন্যদিকে ভাটার সময় খাড়াভাবে ঝুঁকি নিয়ে নামতে হয় ফেরিতে। প্রতিদিন যাতায়াতকারীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কারণে প্রতিনিয়ত সরকারকে দায়ী করে সরকার প্রধানসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের গালিগালাজ শুনতে হচ্ছে। যেহেতু সামনে জাতীয় নির্বাচন সেহেতু সড়ক ও জনপথ বিভাগের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অবহেলা এবং অনিয়ম দুর্নীতির দায় সরকার কেন নেবে? তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা এবং দ্রুত ফেরিঘাট পুনঃমেরামত করে ব্যবহার উপযোগী করার দাবি জানাচ্ছি।

এদিকে সেতু সচিব বরাবর অভিযোগ করায় ধন্যবাদ জানিয়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি। সংগঠনটির মহাসচিব এইচ এম মুজিবুল হক শাকুর দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, শুধুমাত্র কালুরঘাট ফেরিঘাট নির্মাণ করতে দুর্নীতি হয়েছে বা হচ্ছে সেটাতো নয়, দুর্নীতিবাজরা আজ পুরো দেশটাকে গিলে ফেলেছে। সরকারের ভেতর- বাইরে উচ্চ পর্যায় থেকে নিম্নস্তরে সর্বত্র আজ দুর্নীতিবাজরা গেড়ে বসেছে। যত বড় প্রজেক্ট ততবড় দুর্নীতি। ঘুষ লেনদেন ছাড়া আজকাল সহজে কোন কাজ আশায় করা যায় না। সর্বত্র দলীয়করণ ও আত্মীয় করণের নীতি দুর্নীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই ব্যাপারে কার্যকর কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, আমরা বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির পক্ষ হতে এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কর্তা ব্যক্তিদের সমন্বয়ে মনিটরিং সেল গঠন করে সকল মেগা প্রকল্প ও প্রজেক্টগুলো বাস্তবায়নে তদন্ত করে বিল ছাড় করার অনুরোধ জানিয়েছি এবং এই জাতীয় দুর্নীতির সাথে জড়িতদের সনাক্ত করে বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা নিতে জোর দাবি জানাচ্ছি।

বিষয়টি নজরে আসছে বলে জানান জাতীয় সংসদের চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) আসনের সংসদ সদস্য নোমান আল মাহমুদ। বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন জানিয়ে জানিয়ে তিনি দৈনিক দেশ বর্তমানকে বলেন, মানুষ কষ্ট পেলে গালিগালাজ করবে এটা স্বাভাবিক, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমার পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব জনদুর্ভোগ লাঘবে ততটুকু সহযোগিতা করব।

উল্লেখ্য, ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত হয় ৭০০ গজ দীর্ঘ কালুরঘাট রেলসেতু। ১৯৫৮ সালে সেতুটি সব ধরনের যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। ৯৪ বছর বয়সি সেতুটি এখন অনেকটাই ভাঙাচোরা। এতদিন এই জরাজীর্ণ সেতুর ওপর দিয়ে চলেছে ট্রেন ও যানবাহন। এবার কালরুঘাট সেতুর ওপর দিয়ে প্রথমবারের মতো পর্যটন নগরী কক্সবাজারে যাত্রীবাহী ট্রেন চলবে বলে জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। গত ১ আগস্ট সকাল থেকে এ সেতুতে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। সংস্কারের জন্য ৩ মাস এই সেতুতে যানবাহন ও ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে।

দেশ বর্তমান/এআই