কমে যাচ্ছে নতুন অর্ডার ক্রেতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে তৈরি পোশাকশিল্প ক্স হচ্ছে না শিপমেন্ট, শঙ্কায় শিল্পমালিকরা বশির হোসেন খান ১৭ নভেম্বর, ২০২৩ ১:০৯ অপরাহ্ণ শেয়ার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত গার্মেন্টস পণ্য। বলা যায়- তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের উন্নয়নে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগটিও দেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছে, এটি আজ বিশ্বজুড়ে একটি মর্যাদাপূর্ণ ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। এই সেক্টরে কাজ করছে প্রায় দেশের ৪০ লাখ মানুষ। বাংলাদেশের নারীদের বানানো এই পোশাকের একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অনুসারী ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো গার্মেন্টস পণ্যের অন্যতম বাজার। কিন্তু গত ৪ মাসে যুক্তরাষ্ট্র গার্মেন্টস পণ্য আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। শ্রমিক অসন্তোস, বিশৃঙ্খলা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যাহত, পরিবহন ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধিতে শিল্প মালিকদের নাভিশ্বাস উঠেছে। আর ডলার সংকটের কারণে অনেক ব্যাংক কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র খুলতে গড়িমসি করছে। ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধির পর গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রপ্তানীমুখি এ শিল্পে। সব মিলিয়ে চতুর্মুখী সংকটে পড়েছে পোশাক শিল্প। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগেই ঘোষণা দিয়েছে, বাংলাদেশে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে জিএসপি প্লাস সুবিধা দেয়া হবে; না হলে অন্যচিন্তা। গার্মেন্টস পণ্যের এই দুই বৃহৎ বাজার নিয়ে শঙ্কিত গার্মেন্টস শিল্পের মালিকরা। তারা বলছেন, এমনিতেই বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকটে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে। ডলারের সংকটে উৎপাদন খরচ বাড়ছে; তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র গার্মেন্টস পণ্য আমদানি কমিয়ে দিলে গোটা সেক্টর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যাবে। নতুন বাজার খুঁজতে গেলে পণ্য উৎপাদন স্বাভাবিক করতে যে গ্যাস-বিদ্যুৎসহ সাপোর্টের প্রয়োজন সেগুলো নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের উৎপাদিত গার্মেন্টস পণ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে মহাসংকটে পড়ে যাবে এই শিল্প খাত। বেকার হয়ে পড়বেন লাখ লাখ নারী শ্রমিক। একাধিক শিল্প মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণে পোশাক শিল্প চরম সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা আন্দাজ করাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় স্টক ক্লিয়ারেন্স সেল দিয়েও পোশাক বিক্রি বাড়ানো যাচ্ছে না। এ কারণে বিদেশি ক্রেতারা নতুন অর্ডার দিতে চাচ্ছে না। এমনকি পুরোনো যেসব অর্ডার উৎপাদন শেষে শিপমেন্টের অপেক্ষায় আছে; সেগুলোও তারা নিতে চাচ্ছে না। ওয়্যারহাউজে সেসব পণ্য পড়ে আছে। ডেফার্ড পেমেন্টে সেসব পণ্য নেয়ার অনুরোধ জানালেও তাতে সাড়া দিচ্ছে না। বিজিএমইএ সূত্র জানায়, চলতি বছর বিভিন্ন দেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ড। এই বাজারে চীন, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো শীর্ষ রফতানিকারক দেশের তৈরি পোশাক রফতানি কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশ পোশাক রফতানিতে যে নির্ভরতা সেটা ভারত ও চীনের নেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্র পোশাক আমদানি কমালেও ভারত বা চীনের কোনো সমস্যা হবে না। তবে বাংলাদেশে চরম সংকটে পড়ে যাবে। এ ছাড়াও রাজনৈতিক কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন র্যাবের ওপর স্যাংশন দেয়া দেশ থেকে কোনো পণ্য ক্রয় করবেন না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে তাদের মূল এজেন্ডা বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও কূটনৈতিক মহলে চলছে উত্তেজনা। এ অবস্থায় বাংলাদেশ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে না হাঁটলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য আমদানি করা থেকে বিরত থাকার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন গ্রার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা।সূত্র মতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৪৬.৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। যা আগের বছরের তুলনায় ১০.২৭ শতাংশ বেশি। তবে আগের তুলনায় রপ্তানি বাড়লেও বর্তমান বাস্তবতায় পোশাক শিল্পে নতুন করে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া ও চীন ভিত্তিক ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, বর্তমান দুর্বল বিশ্ব অর্থনীতি এবং আরেকটি ভবিষ্যত মন্দা সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে এই খাতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করে তুলেছে। জানতে চাইলে বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম বলেন, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের যে রাজনৈতিক চাপ রয়েছে তা পোশাক খাতে এখনো পড়েনি। তাই পোশাকের রফতানি কমা এখন পর্যন্ত স্বভাবিক বলেই মনে করছি। কারণ তারা পোশাক খাতে এখনো স্বাভাবিকের চেয়ে কম ব্যয় করছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রফতানির নেতিবাচক বছরের শেষ নাগাদ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। কারণ প্রধান এই বাজারে ভোক্তাদের ক্রয় চর্চায় বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। যার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রেতারা ক্রয়াদেশ কম দিচ্ছেন। পোশাকে রাজনৈতিক চাপ না থাকলেও ইদানীং বিভিন্ন শর্ত ও শ্রমিক আইন নিয়ে কথা বলছে। তাই আগামীতে কি হবে সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে আশাবাদী তারা পোশাক খাত নিয়ে কোন ভুল সিদ্ধান্ত নিবেন না। আর নিলে দেশের গার্মেন্টস শিল্প চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যাবে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য মতে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানি মূল্যমান বিবেচনায় ১৯ শতাংশ এবং আকার বিবেচনায় ৩০ শতাংশ কমেছে। গত বছরের জুনে দেশটির মূল্যস্ফীতি চিল ৯ দশমিক ১ শতাংশ। যা ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ফলে নিত্যপণ্য ও জ্বালানি ছাড়া অন্যান্য পণ্য কেনা কমিয়ে দেন দেশটির ভোক্তারা। যদিও দেশটির মূল্যস্ফীতি কমে আসছে। গত এপ্রিলে তাদের মূল্যস্ফীতি কমে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়ায়। ফলে আগামী গ্রীষ্ম মৌসুম থেকে দেশটি থেকে তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ আসা বাড়তে পারে বলে ধারণা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের। তবে গত বছর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি প্রায় অর্ধেকে নামলেও বাংলাদেশ সেই সুবিধা নিতে পারেনি। আর তাই বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আন্তর্জাতিক ও দেশিয় চতুর্মুখী চাপে পড়েছে পোশাক শিল্প। বিশ্বমন্দার কারণে অর্ডার কমে গেছে। বিদেশিদের কাছ থেকে অর্ডার আনা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অর্ডার নিতে পারছি না। এ কারণে বিদেশি ক্রেতারাও অর্ডার দিতে সংকোচবোধ করছে। তার ওপর বন্ড-কাস্টমসের ঝামেলা তো আছেই। তিনি আরও বলেন, সরকার এই শিল্পকে পলিসি সহায়তা দেয়ায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষ সাপোর্ট না দিলে শিল্পের ভবিষ্যৎ কী হবে তা বলা মুশকিল। → শেয়ার FacebookTwitterGoogle+WhatsAppইমেলFacebook MessengerLinkedinপ্রিন্ট