চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহরের বাসিন্দা ও কলেজ পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী গত দুদিন ধরে আগ্রাবাদ মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি। কিছুদিন আগে বৃৃষ্টির সময় হালিশহরে জলাবদ্ধতায় তিনি মশার কামড় খেয়েছেন। এরপর হঠাৎ তার ১০৪ ডিগ্রি জ্বর উঠে। এরপর তিনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার শরীরে ডেঙ্গু ধরা পড়ে। অসুস্থ ছেলের শয্যাপাশে বসে উদ্বিগ্ন মায়ের চিন্তা, কখন সন্তান সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে!
সাধারণত বর্ষায় প্রকোপ বাড়লেও এবার চট্টগ্রামে আগেভাগেই চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। গত এক সপ্তাহ ধরে গড়ে ৭-৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছেন হাসপাতালে। নগরী ছাড়া গ্রামেও ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, চট্টগ্রামে বিগত সময়ের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বেশি বাড়তে পারে। ডেঙ্গুজ্বরে এরই মধ্যে তিনজনের মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়েছে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য প্রশাসন। জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরীর আশঙ্কা, চট্টগ্রামে জুলাই-আগস্টে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ আরও বাড়বে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১২ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ২২৯ জন। এর মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রামের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এখন ৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছে। সর্বশেষ রোববার সকাল থেকে গতকাল সোমবার সকাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৮ জন।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৭৭ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২ জন, মার্চ মাসে ১২ জন, এপ্রিলে ১৮ জন এবং মে মাসে ৪৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। গত বছরের জানুয়ারিতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে জানুয়ারিতে ৯ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪ জন, মার্চ মাসে ১ জন, এপ্রিলে ৩ জন এবং মে মাসে শূন্য। অর্থাৎ চট্টগ্রামে গতবছরের একই সময়ের তুলনায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে দশগুণেরও বেশি।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, প্রতিবছরই চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ২০২০ সালে চট্টগ্রামে রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৭ জন, ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭১ জনে এবং ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৪৪৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী বলেন, ‘এবার পুরোদমে বর্ষা না নামতেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে। সিটি কর্পোরেশন এলাকা ছাড়াও উপজেলাগুলোতেও ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। জুলাই-আগস্টে কী পরিস্থিতি হবে, তা নিয়ে আমরা চিন্তিত।’
থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে জানিয়ে সিভিল সার্জন বলেন, ‘বৃষ্টির পানি জমে মশার লার্ভার সৃষ্টি হচ্ছে। যেখানে এডিশ মশার প্রজনন (বংশ বিস্তার) ঘটছে। মূলত এ কারণেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে।’
ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধের অন্যতম উপায় হচ্ছে মশার লার্ভা ধ্বংস করা, এডিস মশার বংশ বিস্তার রোধ করা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মশক নিধন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে হবে।’
এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা পাওয়ার পর কিছু হাসপাতাল ডেঙ্গু কর্নার খুললেও বাকিরা এখনও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ডেঙ্গু কর্নার খোলা হয়নি। তবে আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্নার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসান দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে এখন ৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আরও বাড়লে ডেঙ্গু কর্ণার স্থাপন করা হবে। এখন আপাততে মেডিসিনের তিনটি ওয়ার্ডে এবং শিশুদের শিশু ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের এখানে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য একটা ব্লক আলাদা করে প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। আমরা ডেঙ্গু রোগীদের সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহী বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগের জীবাণুবাহী এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছে সিটি কর্পোরেশন। এই বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রতি ওয়ার্ডে নালা বা যেখানে মশা জন্মানোর সম্ভাবনা আছে সেখানে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। ক্রাশ প্রোগ্রাম ছাড়াও চসিকের নিয়মিত কার্যক্রমের মধ্যে প্রতিদিন মশক নিধন স্প্রে চলমান রয়েছে। ’
এবছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ বলেন, ‘এ বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গুকে প্রবল দেখা যাচ্ছে। বিগত সময়ে এতোটা প্রকোপ ছিল না। এডিস মশার প্রজনন ক্ষমতা চক্রাকার হারে বাড়ার কারণে এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি।’
এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার বিস্তার সবচেয়ে বেশি ঘটে। জুন-আগস্ট মাস এ জন্য সবচেয়ে উপযোগী। কারণ এ সময় থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হয়। নালা-নর্দমা, ড্রেন ও বাসাবাড়িতে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তারের বেশি সুযোগ পায়।’
চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রামে বেশিরভাগই সাধারণ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। একে বলা হয়, ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার গ্রেড-১ (এতে রক্তক্ষরণ হয় না)। তবে রাজধানীতে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার গ্রেড-২ তে ( চোখ, নাক, ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ হয়) আক্রান্তের হার বেশি। সাধারণত দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার আক্রান্ত হলে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার হয়। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা কমতে থাকে। একজন সুস্থ মানুষের রক্তে প্লাটিলেটের স্বাভাবিক মাত্রা হলো দেড় লাখ। কিন্তু ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে আক্রান্ত হয়ে অনেকের রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা ৫ হাজার পর্যন্ত নেমে আসে। এতে রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা থাকে।
এমএফ