এক বছরে অর্ধডজন যৌননিপীড়ন একই মাদ্রাসায়, এবার শিক্ষক গ্রেফতার!

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে এক মাদ্রাসা শিক্ষককে আটক করা হয়েছে। আটককৃত শিক্ষকের নাম জোবায়ের। তিনি চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানার বাসিন্দা।

রবিবার (২৬ মে) দুপুরে মিরসরাই সদর ইউনিয়নের ওয়ার্লেসে অবস্থিত দারুল উলুম মাদ্রাসায় এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থললে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।

স্থানীয়রা জানায়, হাফেজ মাওলানা মো. শোয়াইব পরিচালিত ওয়ার্লেস দারুল উলুম মাদ্রাসায় প্রতিনিয়ত যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটে। গত এক বছরে এটিসহ অর্ধডজন ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষককে কৌশলে মাদ্রাসা থেকে সরিয়ে দিয়ে ধামাচাপা দিয়ে দেয়া হয়। এসব কাজে স্থানীয় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের ব্যবহার করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হাফেজ মো. শোয়াইব।

ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, ওয়ার্লেস দারুল উলুম মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের দায়িত্বরত শিক্ষক ছুটিতে থাকায় অন্য শিক্ষক হাফেজ জোবায়েরকে সাময়িক দায়িত্ব দেয়া হয়। দায়িত্ব পালন কালিন শনিবার রাতে শিক্ষক জোবায়ের এক শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন নিপিড়ন করেন। পর দিন রবিবার সকালে ওই শিক্ষার্থীর সহপাঠিরা বিষয়টি ক্যান্টিনে প্রকাশ করে দেয়। পরবর্তীতে যৌন নিপিড়নে আক্রান্ত ওই শিক্ষার্থী ক্যান্টিনে এসে পরিবারকে ফোন করে বিষয়টি জানায়। ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় যুবক তানভির শাহরিয়ার মাদ্রাসার শিক্ষকদের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে মাদ্রাসার শিক্ষকরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওই যুবকের ওপর হামলা চালায়। এতে ওই যুবক মারাত্মক আহত হন। এসময় তাকে বাঁচাতে গিয়ে নুরুন্নবী নামে স্থানীয় এক যুবকও আহত হন।

পরবর্তীতে খবর পেয়ে মিরসরাই থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় ও যৌন নিপীড়নে অভিযুক্ত শিক্ষক জোবায়েরকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে আসে।

আহত স্থানীয় বাসিন্দা তানভীর শাহরিয়ার রিয়াজ জানায়, মাদ্রাসার এক শিক্ষার্থীকে যৌন নিপিড়নের বিষয়টি জানার পর আমি ভেতরে গিয়ে হুজুরদের কাছে জানতে চাই। তখন শিক্ষকরা ক্ষিপ্ত হয়ে আমার ওপর লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালায়। আমার ওপর হামলা করতে দেখে স্থানীয় অন্যান্যরা এগিয়ে আসলে মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাদের ওপরও হামলা চালায়।

যৌন নিপিড়নের শিকার শিশু শিক্ষার্থীর কাছে ঘটনার আদ্যোপান্ত জানতে চাইলে সে বলে, ‘আমি শনিবার দুপুর ৩টায় হুজুরের কাছে পড়তে গেলে দুই পৃষ্ঠা কোরআন পড়িয়ে বিকাল ৪টার পরে আসার কথা বলে ছুটি দিয়ে দেয়। এরপর আমি যখন বিকাল ৪ টার পরে বাঁশখালী হুজুরের কাছে পড়তে গেলে তিনি আমার পরনে থাকা পায়জামার চেইন খুলতে বলেন। আমি অপরাগতা প্রকাশ করলে তিনি (হুজুর) আমার পায়জামার চেইন খুলে আমার এক নম্বর ধরে রাখে। পরবর্তীতে আমাকে পর্দার আড়ালে নিয়ে মুখে চুমু দেয়। বিষয়টি আমার সহপাঠিরাও দেখে।

এই বিষয়য়ে জানতে চাইলে মাদ্রাসার পরিচালক হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ শোয়াইব বলেন, অতীতে অন্য শিক্ষকদের রক্ষা করলেও এবার তিনি নিজেই এর উপযুক্ত বিচার চান। এ ব্যাপারে তিনি থানা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

সুরা কমিটির সদস্য স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান দিদারুল আলম জানান, সুরা কমিটির সদস্য হলেও ঘটানার ব্যাপারে তাকে কেউ কিছু জানায়নি। বিষয়টি জেনে প্রতিষ্ঠান প্রধানের সাথে আলোচনা করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান তিনি।

এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির উপদেষ্টা স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। এধরনের অভিযোগ এই প্রথম শুনছেন বলে জানান তিনি। এছাড়া তিনি বলেন, গত বছর তার কার্যালয়ে একটি বৈঠক হলেও সেখানে এই ধরনের কোন অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি।

মিরসরাই থানার অফিসার ইনর্চাজ মো. সহিদুল ইসলাম বলেন, শিশু নিপীড়ন ও হামলার খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হই। অভিযুক্ত শিক্ষককে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া হামলার ঘটনায় আহত ব্যক্তি বাদি হয়ে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জিজ্ঞাসাবাদও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি । ভুক্তভোগী শিশুকে শর্তসাপেক্ষে পরিবারের জিম্মায় দেয়া হয়েছে। পরিবার থেকে লিখিত অভিযোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।