দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিকে উন্নয়নের প্রধান বাধা হিসেবে দেখেন দেশের ৬৯.৪ শতাংশ তরুণ। সেই সাথে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবকে উন্নয়নে প্রধান বাধা মনে করেন ৪৬.৫ শতাংশ, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় প্রাধান্য দেয়াকে ৩২.৬ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার-সমন্বয়ের অভাবকে ২৮.১ শতাংশ তরুণ। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ-এর এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল শনিবার রাজধানী ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটের অডিটোরিয়ামে যুব সম্মেলন ২০২৩-এ জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশের আহ্বায়ক ও সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি, বড় অংশই তরুণ। তাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ এর মধ্যে। বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাময় জনশক্তি যুবরা।
প্রতি দশকে এই বয়সীদের সংখ্যা ও অনুপাত বাড়ছে। ২০০১ সালে ছিল ২৯%, ২০১১ সালে ২৯.৫% এবং ২০২২ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৩৩.৫%। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরে নতুন ভোটার হয়েছে সাড়ে তিন কোটি তরুণ। এই যুবসমাজের আশা আকাঙ্খা প্রত্যাশা আগামী দিনের বাংলাদেশে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যুক্ত করতে আমরা কতটুকু সফল, কতটুকু কার্যকর, কতটুকু ফলপ্রসূ এই জিজ্ঞাসাটা আমাদের বারবার আসছে। এই জিজ্ঞাসার ভেতরে একটা বড় জিজ্ঞাসা হলো রাষ্ট্র, দেশ, রাজনীতি, সমাজনীতি, পেশা পরিচালনার ক্ষেত্রে ঘর-সমাজের ভূমিকা আমরা বজায় রাখতে পারছি কিনা। এবং সেই ভূমিকা বাড়ানোর একটা বড় জায়গা হলো গণতন্ত্রের চর্চা করার ক্ষেত্রে। জরিপে দেখা গেছে, তরুণরা সম্প্রতি অবকাঠামো, তথ্য প্রযুক্তির বিস্তার, শিক্ষায় অভিগমন এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বৃদ্ধির মতো বিষয়ে সাফল্য এসেছে বলে মনে করেন।
যুব জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে উন্নয়নের অগ্রাধিকার হিসেবে দুর্নীতি দমন, জবাবদিহিতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলেছেন ৫৬.২%। ৫৫.৪% উল্লেখ করেছেন মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধি। ৪০.২% জরিপ অংশগ্রহণকারী তরুণ দেশ ও দেশের বাইরে কর্মসংস্থানের উপর জোর দিয়েছেন।
জরিপে দেখা যায়, ৬০.৪% তরুণ মনে করেন, রাজনীতিতে জড়িত তরুণরা কার্যত সাধারণ তরুণদের প্রায় সবসময় প্রতিনিধিত্ব করেন। অন্যদিকে ৩০% মনে করেন একদমই করেন না। ২৪.২% মনে করেন, করলেও তা খুবই কম। ৩৭.৩% অংশগ্রহণকারী বলেছেন, স্ব-স্ব এলাকায়/জাতীয় নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সাধারণ তরুণদের সঙ্গে নিজ থেকে আলোচনা একদমই করে না। ২১.৭% মনে করেন আলোচনা করলেও তা খুবই কম।
৬৭.৮% মনে করেন সরকারের বাইরে থাকা সামাজিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) অথবা নাগরিক সমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বা তাদের মাধ্যমে উন্নয়ন ও নীতিতে মতামত প্রকাশ করা সবচেয়ে কার্যকর পন্থা। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশ করা সমর্থন করেছেন ৫৯.৬%।
৬.৪% যুব জরিপ অংশগ্রহণকারী বেকারদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করার পক্ষে। ৪৮.১% শ্রমিকদের জন্য মৌলিক জীবনযাত্রার খরচ মেটাতে সক্ষম এমন মজুরি প্রদান করার পক্ষে। ৪৮.১% যুব উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা এবং ৪১.৪% ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিরোধী বিভিন্ন আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা বাতিল করার দাবি জানান।
জরিপে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়ে তরুণদের মতামত উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, ১৮.৭% অংশগ্রহণকারী সুযোগ পেলে স্থায়ীভাবে বিদেশে চলে যেতে চান। উচ্চশিক্ষিতের মধ্যে এ ধরনের মনোভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। আরও ১৮.৯% অংশগ্রহণকারী অস্থায়ীভাবে চাকরি বা পড়াশোনা করতে বিদেশে যেতে চান। ৩৫.৪% অংশগ্রহণকারী মনে করেন, যুবসমাজ আগামী দিনে দেশের নেতৃত্ব/দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। ৪৬% মনে করেন, যদি নীতি প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসে তাহলে তরুণরা প্রস্তুত।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এক মাসে পাঁচ হাজার ৭৫ জন তরুণ (১৮-৩৫) অনলাইন জরিপে অংশ নেন। এছাড়াও ২৮টি তরুণ নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠান, ২০টি ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন ও গত ১০ বছরের লিটারেচার রিভিউয়ের মাধ্যমে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়।
যুব সম্মেলনে জরিপের ফলাফল উপস্থাপনের পাশাপাশি সংসদীয় বিতর্ক আয়োজন করা হয়। সম্মেলনের আয়োজন করে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ। সমর্থনে ছিল প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল। ‘দেশ হোক তেমন যুবরা চায় যেমন’ স্লোগানে যুব সম্মেলনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বিভিন্ন সংগঠনের কর্মী, শিক্ষক, গবেষক, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিসহ অনেকে অংশ নেন।সম্মেলনে জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।