পেঁয়াজের ঝাঁজ কমছেই না। দাম না কমলে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে-বাণিজ্য মন্ত্রীর এমন সতর্কবার্তার পরও গায়ে মাখছে না ব্যবসায়ীরা। প্রতিদিন বাজারে উত্তাপ ছড়াচ্ছে রান্নার এই গুরত্বপূর্ণ উপকরণ। বর্তমানে দেশি পেঁয়াজ খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ টাকা। সামনে কোরবান। দর পতনের আলামত দেখছেন না ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
সরকারি হিসেবে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ লাখ টন এবং উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ৩৪ লাখ টনের কাছাকাছি। সরকারি হিসেবেই পেঁয়াজ উদ্ধৃত থাকার কথা ১০ লাখ টন। এমন বাস্তবতায় পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা খুঁছে পাচ্ছেন না ভোক্তারা। মিলাতে পারছেন না জমা-খরচের হিসাব। পেঁয়াজের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তাদের জন্য বড় বিড়ম্বনার কারণ হয়ে উঠেছে।
দেশের বৃহত্তম পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরাও বলছেন, কয়েক বছর ধরে নির্দিষ্ট কিছু সময়ে পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিকভাবে উত্থান-পতন ঘটেছে। এমন অস্থিতিশীলতার মধ্যে দেশে ধারাবাহিকভাবে পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। কমেছে আমদানি। সরকার গত ১৫ মার্চ পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি (আই.পি.) বন্ধ করে দেয়। কিন্তু তাতে পেঁয়াজের পাইকারী ও খুচরা বাজারে তেমন প্রভাব পড়েনি। সরবরাহ ছিলো প্রচুর। দাম ছিলো নাগালের মধ্যে। এক মাস আগে রমজানে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে মানভেদে ৩০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে।
খাতুনগঞ্জের সৌমিক ট্রেডার্সের কর্ণধার জসীম উদ্দীন বলেন, উৎপাদনের এমন ভরা মৌসুমেও পেঁয়াজের সরবরাহ নেই কেন তা বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে কোরবানের আগে পেঁয়াজের দাম আরও বাড়তে পারে। লাগাম টেনে ধরতে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি খুলে দিতে হবে।
চট্টগ্রামের কয়েকটি পাইকারী ও খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ টাকায়। অলিগলির খুচরা দোকানগুলোতে ৯০ টাকাও হাঁকছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে পেঁয়াজের দাম ৬৬-৭১ টাকার মধ্যে। কিন্তু বাস্তবতার সাথে মন্ত্রণালয়ের এ পরিসংখ্যানের বিস্তর ফারাক।
গত ১৫ দিন আগে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। আর এখন মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ টাকয়। সরকার পেঁয়াজের আমদানি অনুমতি বন্ধ করে দেওয়ায় এখন চট্টগ্রামের পাইকারী বাজার খাতুনগঞ্জে আট-দশটির বেশি পেঁয়াজবাহী ট্রাক ঢুকছে না। অথছ গড়ে পেঁয়াজের ট্রাক ঢুকেছে ৫০টির উপরে। কিন্তু খোদ খাতুনগঞ্জের বাজারে পেঁয়াজের সংকট।
প্রশ্ন হলো সরকারি হিসেবে ৩৪ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদন হলে,চাহিদা মিটিয়ে আরও ১০ লাখ টন উদ্ধৃত থাকার কথা। কিন্তু উদ্ধৃত্ত পেঁয়াজ গেল কোথায়। এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন দেশ বর্তমানকে বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আমদানি বন্ধের সুযোগে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজার তদারকি কার্যক্রম জোরদার করে এসব ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
গত ১১ মে বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, দু-এক দিনের মধ্যে পেঁয়াজের দাম না কমলেও আমদানি করবে সরকার। গতকাল শুক্রবার মন্ত্রী একই কথা পুনঃ ব্যক্ত করেছেন। মন্ত্রীর এ ঘোষণায়ও বাজারে কোনো প্রভাব পড়েনি।
জানা যায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে সীমিত পরিসরে আমদানির অনুমতি প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘খুচরা বাজারে পেঁয়াজের দাম এক মাস আগেও ছিল ৩০ টাকা, এক সপ্তাহ আগে ছিল ৫০ টাকা আর বর্তমানে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। সরবরাহ বাড়িয়ে পেঁয়াজের দাম স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়ার দরকার।’ পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল করার স্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে সীমিত পরিসরে আমদানির অনুমতি (আইপি) দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
বাজার বিশ্লেষণ: এদিকে গতকাল শুক্রবারের বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আদা, জিরা, রসুনসহ সব ধরণের মসলার দাম বেড়েছে। আদা বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৩০০ টাকা। তবে ভাল মানের চায়না আদা বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৪০০ টাকায়। অথচ মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও দেশের বাজারে আদা বিক্রি হয়েছে ১৮০ টাকায়। কয়েকদিন আগে জিরার দাম কেজিপ্রতি ৩০০ টাকা বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। ১২০ টাকার রসুন বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়।কাঁচামরিচের দামও নাগালের বাইরে। বাজারে কাঁচামরিচের কেজি এখন ২০০ থেকে ২২০ টাকা। মসলা ও শাক-সবজিসহ সব ধরণের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চড়া দামের কারণে বিপাকে সাধারণ মানুষ। সংসার চালাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমদানি বন্ধের অজুহাতে বাজার সিন্ডিকেট ইচ্ছামতো পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে, বলছেন ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন।