ঈদ সামনে রেখে সরগরম চট্টগ্রামের খলিফাপট্টির দর্জিপাড়া

দর্জি বা খলিফা বলতে যারা কাপড় সেলাইয়ের কাজ করে তাদের বোঝায় যদিও শব্দ দুটির প্রচলন আধুনিক সমাজে তেমন একটা নেই বললেই চলে।  বর্তমান প্রজন্ম যাদের টেইলর হিসেবে সম্মোধন করে থাকে চট্টগ্রামের প্রচলিত বাংলায় তাদের খলিফা বলা হয়ে থাকে।

চট্টগ্রাম শহরে দর্জিদের ঐতিহ্যগত স্থান খলিফাপট্টি। সারা বছর তেমন জমজমাট না থাকলেও রমজান এলে এখানে বেড়ে যায় কাপড় ব্যবসায়ী ও খলিফাদের তোড়জোড়।  ঈদকে কেন্দ্র করে খলিফাপট্টির দর্জিপাড়ায় রকমারি পোশাক তৈরির হিড়িক পরে। দিন রাত নির্ঘুম কাজ চলে।  এসময় প্রায় তিন থেকে চার হাজার খলিফা কাজ করেন এখানে।  ছোট ছোট রুমে মেশিনে বসে অবিরাম কাজ করে যান খলিফারা।  যত বশি কাপড় সেলাই করতে পারবেন ততবেশি টাকা উপার্জন করতে পারবেন।  তবে কেউ কেউ জানালেন, তাদের কাজের পরিবেশটা আরেকটু স্বাস্থ্যসম্মত হলে ভাল হতো।

বছরের পর বছর ব্যবসা করে গেলেও ভবনগুলোর কোন পরিবর্তন হয়নি, পরিবর্তন হয় নি খলিফাদের ভাগ্যের।  খলিফারা কেউবা মাসিক বেতনে আবার কেউবা দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করছেন এখানে।  বর্তমানে এখানে রয়েছে প্রায় দুই থেকে আড়াইশ কাপড় ব্যবসায়ী।  এখানকার সিংহভাগ ব্যবসায়ী এসেছেন নোয়াখালি থেকে।  চট্টগ্রাম শহরের বুকে এটাকে একখÐ নোয়াখালীও বলে থাকেন অনেকে।

এসময় ব্যবসায়ীদের মুখে জানা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর আইয়ুব আলী নামে একজন দর্জিসহ কয়েকজন কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে আসে।  এখানে তারা নগরীর ঘাটফরহাদবেগে কাপড় সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন।  তাদের হাত ধরে গোড়াপত্তন এই খলিফাপাড়ার। ধীরে ধীরে যা ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে খলিফাপট্টি নামে।

দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বাজারে কাপড় সেলাইয়ে সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করলেও করোনার মরণ ছোবল থেকে বাঁচতে পারেনি এই খলিফাপট্টিও।  করোনার পূর্বে ঈদ মৌসুমে দৈনিক তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকার অর্ডার হলেও বর্তমানে দৈনিক ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার হতে কষ্ট হয়ে যায়।  এ কসময় ঈদের সিজনে স্লিপ বা মেমো লিখতে লিখতে হাত ব্যথ্যা হয়ে যেত কিন্তু এখন দিনের অনেকটা সময় অবসর বসে থাকতে হয় বলে জানালেন ব্যবসায়ীরা।

বুধবার (২৯ মার্চ )  নগরীর দেওয়ানবাজার ঘাটফরহাদবেগ খলিফাপট্টি এলাকা ঘুরে পাওয়া যায় এমন চিত্র।  এসময় তারা জানান, বর্তমানে এখানে প্রায় ২৫০-৩০০ পাইকারি কাপড়ের দোকান আছে। যদিও করোনা মহামারির পূর্বে এখানে প্রায় চারশতাধিক দোকান ছিল।  একসময় জমজমাট ব্যবসা থাকলেও বর্তমানে নেই সেই জৌলস। করোনা মহামারি অনেক ব্যবসায়ীকে সর্বশান্ত করে দিয়েছে।  এখানে সকল ব্যবসায়ীর নিজস্ব ছোট আকারের কারখানা আছে।  এসব কারখানায় শিশুদের জামা, ফ্রক, দুপিস-থ্রি পিসসহ ছেলে-মেয়েদের লেহেঙ্গা, থ্রিপিস, স্কার্ট, শাড়ি, পাঞ্জাবি, পায়জামা ও বিভিন্ন বয়সের নারী ও কিশোরীদের জামাকাপড় তৈরি হয়।  এসব কাপড় চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন মার্কেটে ও আশপাশের উপজেলাসহ তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবনসহ দেশের বেশকিছু জেলার খুচরা বিক্রেতারা কিনে নিয়ে যান। দেশের বাজারে ব্যপক চাহিদা রয়েছে এখানকার তৈরি পোশাকের।  দামে সাশ্রয়ী ও মান সম্পন্ন হওয়ায় মানুষের কাছে ব্যপক সুনাম আছে এখানকার কাপড়েরা।

তাসনিয়া ফ্যাশনের মালিক আলাউদ্দিন বলেন, নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানায় তার বাড়ি।  ১৯৮৬ সালে তিনি চট্টগ্রামে আসেন; তার বড় ভাই মো বেলাল হোসেন এখানে প্রথম দরজির ব্যবসা শুরু করেন। তার হাত ধরেই আলাউদ্দিন এই ব্যবসায় জড়িত হন।  বর্তমানে তার দোকানে তিন জন কর্মচারী ও কারখানায় ১২ থেকে ১৪ জন খলিফা কাজ করছেন।  বর্তমানে ব্যবসা অনেকটা ঝিমিয়ে গিয়েছে।  করোনা মহামারির আগে যে ব্যবসা ছিল বর্তমানে তার অর্ধেকও নেই বললে চলে।

তিনি বলেন, প্রতি বছর ঈদে খলিফাপট্টির স্পেশাল কিছু আইটেম মার্কেট দখল করে নেয়।  যেমন নায়রা, গারারা, পাখি, শারারা, আনারকলি ইত্যাদি। ব্যবসায় আগের সেই হাওয়া না থাকলেও এবার ঈদেও থাকছে মেয়েদের জন্য খলিফাপট্টি স্পেশাল নেহেড়া থ্রি পিস।  এছাড়াও থাকছে বাচ্চাদের স্পেশাল পার্টি ফ্রক।

আলাউদ্দিন আরো বলেন, করোনার আগে এখানে প্রায় পাঁচশর মত দোকান ছিল।  কিন্তু করোনা কালে অনেকে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।  দেশে অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে ব্যবসায়ীরাও ঝিমিয়ে গেছেন।  এখন চারশর মত দোকান আছে এখানে।  কিন্তু নেই আগের সেই জৌলস।  কোন রকমে টেনে টুনে চলছেন ব্যবসায়ীরা। যদিও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে ও জমজমাট করতে খলিফাপট্টি বণিক কল্যাণ সমিতির বিন্দু মাত্র ত্রুটি নেই বলে জানালেন এই ব্যবসায়ী।

মো. শোয়েব নামে  আরেক খলিফার সাথে কথা বলে জানা যায়, তার বাড়ি নোয়াখালি জেলার মাইজদি সদরে।  প্রায় দুই যুগ ধরে এই দর্জি কাজ করছেন।  প্রথমে নোয়াখালিতে কাজ করলেও ২০০৮ সালে চট্টগ্রামে চলে আসেন।  এখানে কর্ণেলহাট, হকার মার্কেটসহ বেশ কিছু জায়গায় কাজ করেছেন।  বর্তমানে আন্দরকিল্লা খলিফাপট্টির শফি গার্মেন্ট নামে একটি কারখানায় কাজ করছেন।  এবারের ঈদে তাদরে স্পেশাল আইটেম থাকছে শারারা ও গারারা। এগুলো ছাড়াও মেয়েদের ওয়ান পিস, বাচ্চাদের ফ্রক, জামাতো আছেই।  সব ধরণের পোশাক তৈরি করতে পারেন তারা।  শুধু একটা স্যাম্পল দিলেই তারা হুবহু কপি তৈরি করতে পারেন বলে জানান তিনি।
এসময় কারখানায় কর্মরত খলিফারা বলেন, এখানে কাজের সাথে মজুরির মিল নেই।  দৈনিক খরচের টাকা দিলেও কাজের তুলনায় মজুরি খুবই কম।  ঢাকার তুলনায় অনেক কম মজুরি দেওয়া হয় তাদের।  ঢাকায় প্রতিটি কাপড় সেলাইয়ের জন্য ১০০- ১২০ টাকা দেওয়া হয়।  আর চট্টগ্রামে দেওয়া হয় ৬০-৭০ টাকা। তাই কাজ ও মান একই হলেও মজুরি বৈষম্য হচ্ছে বলে জানান তারা।

এছাড়া এখানকার দর্জিরা শিশু ও কিশোরীদের প্রতিটি ফ্রক সেলাই করে মজুরি পান ৩০ টাকা।  দিনে ১২ টির মতো ফ্রক সেলাই করতে পারেন একজন খলিফা।  তবে কাপড়ে জরি, চুমকি ও লেসের কাজ থাকলে মজুরি একটু বেশি পায় বলে জানান তারা।  মূলত কাজের ওপর নির্ভর করে তাদের মজুরি নির্ধারণ হলেও বর্তমান বাজারে তা যথাপোযুক্ত নয় বলে জানালেন তারা।

খলিফাপট্টি বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনা মহামারির সময় কয়েক বছর ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়েন।  তবে গত বছর ও এবার মিলিয়ে সেই লোকসান কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন তারা।  এবছরের ব্যবসায়ীরা বেচা-বিক্রি, কাজের অর্ডার মোটামুটি পাচ্ছে বলে জানান তারা। তবে এখানকার ঘিঞ্জি পরিবেশ ও পুরনো ভবনগুলো নিয়ে ব্যবসায়ীরা চিন্তায় রয়েছেন।  ব্যবসায়ী ও খলিফাদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে ভবন ও কারখানাগুলো উন্নয়ন দরকার বলে জানান তিনি।  চট্টগ্রামের ঐতিহ্যগত এই খলিফাপট্টির ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন তারা।
খলিফাদের মজুরি বিষয়ে তারা বলেন, এখানে যার কাজ যেমন, তার মজুরিও তেমন।  যেসব পোশাক তৈরি করতে খলিফাদের বেশি সময় লাগে, সেসব কাজের মজুরি বেশি। তবে সারা বছর ব্যবসা একই রকম না থাকায়, ঈদের মৌসুমে অনেক বেশি মানুষের প্রয়োজন হয়।  তখন দৈনিক কাজের ভিত্তিতে খলিফাদের মজুরি দেওয়া হয়।  এছাড়া ব্যবসায়ীরা যদি টিকে না থাকে, লাভ করতে না পারে, তাহলে তো কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।