সরকার বিরোধী আন্দোলনকে তীব্র থেকে তীব্রতর করতে ঈদের পর রাজপথ দখলে নিতে নানা প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। একই সাথে সরকারী দল আওয়ামী লীগও কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকার প্রস্তুতি জোরদার করার খবর পাওয়া গেছে। গত ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বড় ধরনের সমাবেশ করে সরকারের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনের সূচনা করে বিএনপি। ধাপে ধাপে আন্দোলনকে একটা যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে নানাভাবে কর্মসূচি সাজাচ্ছে দলটি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তারা শীঘ্রই নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করবেন। তিনি বলেন এখনো সময় আছে, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যবস্থা করা হোক। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এ বক্তব্যের জবাবে সরকারী দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি যখনোই ক্ষমতায় এসেছে তখনোই দুর্নীতি ও লুটপাটের মহোৎসবে মেতেছে। সেই ধারাবাহিকতায় তারা ষড়যন্ত্র আর লুটপাটের রূপরেখা চূড়ান্ত করেছে। দুই নেতার বক্তব্যেই ফুটে উঠেছে ঈদের পরের রাজনীতি কতটা কি হবে।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছরের শুরুর দিকে অনুষ্ঠিত হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলে ভোটের আগে এটাই হতে যাচ্ছে শেষ ঈদ। ঈদ রাজনীতিতে গণসংযোগ, নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং বিরোধীদের আন্দোলন মোকাবিলার প্রস্তুতি এগিয়ে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ। সরকারি দলের বেশিরভাগ এমপিই নিজ এলাকায় অবস্থান করবেন। ঈদ ঘিরে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীরাও। স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করবেন তারাও। একই সঙ্গে চলবে নির্বাচনি প্রচারণা। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরবেন জনগণের সামনে। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, এবারের ঈদে নির্বাচনি আমেজ থাকবে। দলের নেতাকর্মী, সংসদ-সদস্য ও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের জনগণের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে গণসংযোগ করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈশ্বিক সংকটের কথা মাথায় রেখে নেতাকর্মীদের অসহায় মানুষের পাশে থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সব সময় তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দেশের মানুষের পাশে ছিল, আছে এবং থাকবে। বিশ্বে অর্থনৈতিক একটা সংকট চলছে এবং এর প্রভাব কিছুটা বাংলাদেশেও পড়েছে। এছাড়া সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলে এবার আমরা আরও বেশি করে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। যাতে সবার ঈদ আরও সুন্দর ও স্বস্তিতে হয়। বিএনপির আন্দোলনের হুঁশিয়ারি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো নিয়ে আমরা চিন্তিত নই। আমরা জনগণকে সতর্ক করছি। নিজেদের সাংগঠনিক তৎপরতাকে আরও জোরদার করার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে আমাদের দলীয় সভাপতি আমাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
গতকাল াএক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন,‘দুর্নীতির বরপুত্র, খুনি, পলাতক আসামি তারেক রহমানের প্রেসক্রিপশনে প্রণীত কোনো রূপরেখা নিয়ে জাতির আগ্রহ নেই। পেছনের দরজা দিয়ে তাদের ক্ষমতা দখলের দিবাস্বপ্ন দেশের জনগণ পূর্ণ হতে দেবে না। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেশবিরোধী সব ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত প্রতিহত করবে।’
এদিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, বিএনপির সরকার পতন আন্দোলন কোন ঈদের পর কেউ জানে না। তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে আন্দোলন করে, এতে জনগণের সম্পৃক্ততা নেই। দলটি ইস্যু ছাড়া আন্দোলন করে। এ জন্য হাঁকডাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বিএনপির আন্দোলন। ঈদের পর আওয়ামী লীগ জনগণকে সাথে নিয়ে দেশবিরোধী যে কোন ষড়যন্ত্রের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেবে। রাজপথ কাউকে লিজ দেয়া হয়নি।
মাঠের বিরোধী দল বিএনপি চলমান আন্দোলনকে অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌছাতে ঈদের পর রাজপথে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্ব শুরু করবে। এ জন্য দলীয় নেতাকর্মীদেরকে ঈদ করে ঢাকায় ফিরে আসার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঈদের পর আবারও রাজপথের কর্মসূচি নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে যাবার চেষ্টা করা হবে। সেপ্টেম্বরে আন্দোলনকে যৌক্তিক পর্যায়ে পৌছে দিতে নানা পরিকল্পনা করা হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল করিব রিজভী ‘দেশ বাঁচাতে মেহনতি জনতার পদযাত্রা’ শিরোনামে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন।
তিনি জানান, দেশব্যাপী কয়েকটি অঞ্চলে ছয়টি শহরে এই পদযাত্রা কর্মসূচি হবে। আগামী ১৫ জুলাই নোয়াখালীতে পদযাত্রার মাধ্যমে এই কর্মসূচির শুরু হবে। দিনাজপুরে ১৯ জুলাই, রাজশাহীতে ২৮ জুলাই, যশোরে ৫ আগস্ট, হবিগঞ্জে ১২ আগস্ট ও বরিশালে ১৯ আগস্ট কর্মসূচি পালিত হবে।
রিজভী বলেন, দলের পক্ষ থেকে দেশ বাঁচাতে ‘মেহনতি মানুষের পদযাত্রা’ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচি সফল করবে জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, জাতীয়তাবাদী তাঁতী দল ও জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দল। ইতোমধ্যে কর্মসূচি বাস্তবায়নের সমন্বয়ক বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন ওই চার সংগঠনের নেতাদের নিয়ে প্রস্তুতি বৈঠক করেছেন।
এদিকে গত ২৬ জুন বিকালে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময়কালে মির্জা ফখরুল বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা দেবে। তবে ঠিক কবে এই রূপরেখা দলটি চূড়ান্ত করবে, তা জানাননি তিনি।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা এ সরকার নিয়ে আরও সুস্পষ্টভাবে কথা বলব। এজন্য আমরা সকলের সঙ্গে আলোচনা করছি। দেশে যারা সংবিধান বিশেষজ্ঞ আছেন বা আইনজীবী আছেন, তারা তাদের মতো করে তাদের মতামত দেবেন। সেখান থেকে একটা ভালো জিনিস বের হয়ে আসবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এখনও বলছি, তাদের (সরকার) শুভবুদ্ধির উদয় হোক, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যবস্থা করা হোক। তবে নির্বাচনের আগে তাদের পদত্যাগ করতে হবে। এটা খুবই জরুরি। কারণ এই সরকার যদি ক্ষমতায় থাকে, তাহলে কোনোভাবেই নির্বাচন সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না।’
ঈদের পরে আন্দোলন আরও বেগবান হবে মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘যারা আমাদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে আন্দোলন আরও বেগবান করা হবে।’
সূত্র জানায়, শুরুতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মধ্য দিয়েই শুরু হবে একদফার আন্দোলন। এর মধ্যে থাকতে পারে গণসমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল, পদযাত্রা ও গণ-অবস্থান। এরপর সময় ও সুযোগ বিবেচনায় ঘোষণা করা হবে কঠোর কর্মসূচি। সেক্ষেত্রে ঢাকা ঘেরাও, ঢাকায় অবস্থানের মতো কর্মসূচি রয়েছে তাদের পরিকল্পনায়।