চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে কি শেষ পর্যন্ত সংলাপেই যাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো? সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সংলাপ নিয়ে করা একটি বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে এখন আলোচনা হচ্ছে বেশ জোরের সাথে। মন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের আয়োজনে সংলাপ হতে পারে। কমিশন আওয়ামী লীগকে ডাকলে আওয়ামী লীগ সেই সংলাপে অংশ নেবে।
এদিকে ঢাকায় সফররত মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া বলেছেন, আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ চায়, কিন্তু প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করবে না। সফররত ইইউ প্রতিনিধি দলের সদস্যরাও সরকার ও বিরোধী দলের নেতাদের সাথে বৈঠকে নির্বাচনের বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। তারা অন্যান্য বিষয়ে বেশি কথা বলেছেন। এর মধ্যে সরকারী দলের প্রভাবশালী মন্ত্রীর সংলাপ বিষয়ে বক্তব্যেকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বেশ কয়েক মাস ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও মাঠের বিরোধী দল বিএনপি পাল্টাপাল্টি কর্মসূচী পালন করে আসছে। বিদেশি কূটনীতিকরা গত তিন মাস ধরে দুই পক্ষের সাথে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। সর্বশেষ ইইউ ও মার্কিন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল কয়েকদিন ধরে দেশে দৌড়ঝাপ করে যাচ্ছে। তাদের বক্তব্যে কেউ দুই পক্ষকে সরাসরি সমস্যর সমাধানে সংলাপ করার কথা বলেনি। তবে তাদের মধ্যে ভেতরে ভেতরে কি কথা হয়েছে তা কোন পক্ষই প্রকাশ করেননি। সরকারী দলের নেতারা বলছেন বিদেশিরা আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকারের উপর কোন প্রকার চাপ সৃষ্টি করেননি। তারা সুষ্ঠ নির্বাচন দেখতে চায়।
গতকাল চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের কাছে সাংবাদিকরা বিএনপির নিরপেক্ষ সরকারের দাবি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচন আয়োজক প্রতিষ্ঠান হচ্ছে নির্বাচন কমিশন। সংলাপ নিশ্চয়ই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে হতে পারে। সুতরাং নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে যদি কোনো কথাবার্তা বলতে হয় সেটি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বলতে হবে। তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে যেতে পারে, তাদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারে। নির্বাচন কমিশন যদি আমাদের ডাকে আমরাও যাবো।
সরকারী দলের এই প্রভাবশালী নেতার বক্তব্য রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল গুরুত্ব দিয়ে বলছেন, নিশ্চয় দুই পক্ষকে নির্বাচন নিয়ে সমাঝোতার কথা হয়ত বলেছেন। নির্বাচন কমিশনের অধীনে যেহেতু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সুতরাং স্বাধীন এই প্রতিষ্ঠান দুই পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করতেই পারে। সরকারী দল এতদিন বিএনপির সাথে কোন প্রকার আলোচনাকে নাকচ করে দিয়ে আসছিল। বিদেশিদের পরামর্শকে গ্রহণ করে হয়ত ইউ টার্ন নিয়ে পরোক্ষভাবে সংলাপ নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করছেন।
এদিকে গতকাল শুক্রবার আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন ঢাকায় সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলেনি, তারা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের কথা বলেছে।
তিনি বলেন, বিদেশিরা সবাই নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে আসেনি। বিদেশিরা সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেবে, সংসদ ভেঙে দিতে বা প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলবে বিএনপি এমন মনোভাব দেখিয়ে অপপ্রচার করলেও তা হয়নি। বিদেশিরা বাংলাদেশে শুধু সুষ্ঠু নির্বাচন চায় একথা জানিয়েছে, কিন্তু তারা নিষেধাজ্ঞা বা অন্য কোনো কথা বলেনি।
বিএনপি বিদেশিদের কাছ থেকে পক্ষপাতমূলক আচরণ আশা করেছিল মন্তব্য করে কাদের বলেন, বিদেশিদের কাছ থেকে আশানুরূপ কিছু পায়নি বিএনপি। বিএনপি এখানে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচন ভণ্ডুলের ষড়যন্ত্র করছে, নির্বাচনে সহিংসতা হলে বিএনপিকেই তার দায় নিতে হবে।
এদিকে গতকাল আইনমন্ত্রী আনিসুল হক নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন,আমরা বাংলাদেশের সংবিধান মেনে চলি। তার কারণ হচ্ছে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা আমাদেরকে এই সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন। আমরা সেই সংবিধান মেনেই নির্বাচন করব। যারা এই সংবিধান মানে না তারা নিজেদেরকে বাংলাদেশের নাগরিক বলাটা সঠিক হবে না।
এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে গুলশানে ঢাকায় নিযুক্ত কানাডীয় হাইকমিশনার লিলি নিকোলসের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের কাছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান ,আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কানাডা নিবিড়ভাবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
বৈঠকের আলাপচারিতা প্রসঙ্গে আমীর খসরু বলেন, ‘তারা (কানাডা) জানতে চায় যে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য কী করা প্রয়োজন। বর্তমান পরিবেশ সম্পর্কে তারা জানে। তারপরেও তারা আমাদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চেয়েছে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় আমরা বলেছি, এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়ার সুযোগ নাই।’
আমীর খসরু বলেন, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দেশগুলো বাংলাদেশকে পর্যবেক্ষণ করছে। একইভাবে কানাডাও বাংলাদেশকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
এদিকে বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ নিয়ে প্রত্যক্ষ কোনও হস্তক্ষেপ করবে না বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন উজরা জেয়া।
দীর্ঘদিনের অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র তার ভূমিকা রাখতে চায় বলে উল্লেখ করেন উজরা জেয়া। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশাপাশি সরকারের একাধিক মন্ত্রী অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। উজরা জেয়া বলেন, নির্বাচন কবে হবে তা বাংলাদেশই ঠিক করবে।
নির্বাচনের আগে বড় দুই দলের মধ্যে সংলাপের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে এই মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি বলেন, ‘আমরা সবাই সংলাপ চাই। তবে এই প্রক্রিয়ায় আমরা সরাসরি যুক্ত নই।’
ঢাকায় সফররত মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া বলেছেন, আসন্ন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করবে না।
বৃহস্পতিবার (১৩ জুলাই) দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেনের সাথে সাক্ষাত শেষে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রীরা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিষয়ে জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র সব সময় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনকে সমর্থন করে। তবে সংলাপের বিষয়ে বলব, এ বিষয়ে আমাদের প্রত্যক্ষ কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না।
তিনি বলেন, বুধবার দুই রাজনৈতিক দল যে সমাবেশ করেছে সেটা আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি এবং সেখানে কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। এটা একটা ভালো অনুশীলন। আমরা এটার পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই।
বাংলাদেশে কখন নির্বাচন হবে সেটা বাংলাদেশই সিদ্ধান্ত নেবে, বলেন তিনি।
গত ৫ দশক ধরে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চমৎকার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে উজরা জেয়া বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সাথে দুই দেশের চমৎকার সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছি। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায়।
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সবসময় বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্রে সমর্থন করে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করছে একটি সমৃদ্ধশালী দেশের ভবিষ্যত। নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণের অবাধ অংশগ্রহণের ওপর সেটা নির্ভর করছে।’
আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনের বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলেও তাদের জানিয়েছি।