ইসিরই যত মাথাব্যথা

আগামী নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নয়, বরং নির্বাচন কমিশনই যেন বেশি মাথা ঘামাচ্ছে।  মনে হচ্ছে, রাজনৈতিক দলের চেয়ে তাদেরই (ইসি) গরজ বেশি। যদিও এক অর্থে কথাটা ঠিক, কারণ নির্বাচন পরিচালনা করা নির্বাচন কমিশনেরই কাজ।  কিন্তু বর্তমানে দেশের যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাতে বিরোধীদলগুলো তত্ত¡াবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে গোঁ ধরে আছে।  অন্যদিকে সরকারীদলের মন্ত্রী ও নেতারা প্রতিনিয়িত তাদের বক্তৃতা বিবৃতিতে বলছেন যে, নির্বাচন কমিশনের অধিনেই নির্বাচন হবে। তারা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার অসাংবিধানিক, যা একবার সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাকে ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন অবান্তর।

নির্বাচন কমিশনের আগাম প্রস্তুতি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছে বিএনপি, সমমনাদল ও গণতন্ত্র মঞ্চ।  রোববার (০২ এপ্রিল) রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে গণতন্ত্র মঞ্চের লিয়াজোঁ কমিটির সঙ্গে বৈঠকে ইসির আগাম প্রস্ততির বিষয়টি তাদের আলোচনায় উঠে আসে।  বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক নেতা বলেছেন, হঠাৎ করেই নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনি তৎপরতা ও বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপের জন্য ডাকা সরকারের কূটকৌশলের অংশ নয়তো? তারা মনে করছেন, সরকারের পরামর্শে আগাম নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।  বিরোধী দলগুলো যেহেতু ডিসেম্বর-জানুয়ারিকে সামনে রেখে কর্মসূচি প্রস্তুত করছে সে কারণে বিরোধী দলগুলোকে অপ্রস্তুত রেখে নির্বাচন করতেই ইসির এই আগাম তৎপরতা।

এর আগে গত মঙ্গলবার (২৮ মার্চ) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, বিএনপিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।  আমন্ত্রণ জানানো সরকারের কোনো কূটকৌশলের অংশ নয়, এতে সরকারের সংশ্লিষ্টতা নেই। কূটকৌশল হলে সেটা ইসির হতে পারে, সরকারের নয়।  সরকারের পরামর্শেও চিঠি দেওয়া হয়নি।  আর নির্বাচন কমিশন কখনও কূটকৌশল হিসেবে এ কাজটি করেনি।

সিইসি বলেন, মূল জিনিসটা হলো, আমরা কিন্তু সংলাপে আহবান করিনি।  সংলাপ বিষয়টি আনুষ্ঠানিক।  আমরা কোনোভাবেই ওনাদের সংলাপে ডাকিনি।  আমরা সুস্পষ্টভাবে বলেছি, আনুষ্ঠানিক না হলেও, আনুষ্ঠানিক মানে সংলাপ; অন্তত অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় আপনারা আসতে পারেন।  অত্যন্ত বিনীতভাবে এ আহবান করেছি।

হাবিবুল আউয়াল বলেন, চিঠি কমিশন থেকে দেওয়া হয়েছে।  সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী নয়।  আমরা ব্যথিত হই, যখন বলা হয়, সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করি, আজ্ঞা বহন করিনি।  আমরা নির্বাচন বিষয় নিয়ে আলাপ করে আমাদের চিন্তার মধ্যে ফুটে উঠেছে, বিএনপির মতো দলকে নির্বাচনে আনতে পারলে ভালো হয়।

সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, দেশ বিদেশে ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবরা আবার সক্রিয় হয়েছে।  তারা বিশেষ ধরণের সরকারের স্বপ্ন দেখছে। বিএনপি বুঝতে পেরেছে নির্বাচনে তাদের আশা নেই।

তিনি বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি সর্বশক্তি দিয়ে অংশগ্রহণ করে আসন পেয়েছিল মাত্র ২৯ টি।  ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে তারা পালিয়ে গিয়েছিল। ডান বাম, অতি ডান- অতি বাম তালেবান সবাইকে একসঙ্গে করে ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে মহিলা আসনসহ সিট পেয়েছিল ৭টি।  ড. কামাল হোসেনের মতো মানুষকে হায়ার করেছিল। হায়ারে খেলতে গিয়ে কামাল হোসেন সাহেব ভালো খেলতে পারেননি।  বিএনপিকে ইঙ্গিত করে মন্ত্রী বলেন, তারা জানে আগামী নির্বাচনে তাদের কোনো সম্ভাবনা নেই।

গত ১৪ বছরে জননেত্রী শেখ হাসিনার আমলে উন্নয়ন ও অগ্রগতি হয়েছে। এতে জনগণ শেখ হাসিনাকে আবার নির্বাচিত করবে, সেটা তারা বুঝতে পেরেছে। তারা যে জ্বালাও পোড়াও রাজনীতি করেছে, মানুষ পোড়ানোর রাজনীতি ও অপরাজনীতি করেছে, সেজন্য মানুষ তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।  সেজন্য ওয়ান ইলেভেন কুশীলবরা ও বিএনপি একজোট হয়েছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বিলুপ্ত ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে শিগগির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের যৌথ ঘোষণা দেওয়া হবে।  এই সরকারের অধীনে আমরা নির্বাচন হতে দেবো না, জনগণ হতে দেবে না।’

তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক উন্নয়ন ও আরও দৃঢ় করা যায় এবং আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নেওয়া যায় সে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলছি।  আন্দোলনকে আরও বেগবান করে এই ভয়াবহ দানবীয় সরকারকে সরিয়ে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকারকে প্রতিষ্ঠা করতে পারব।

বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার যাদের ভোট চুরির প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্ব দিয়েছে- তারা তারা এখন সংলাপের নামে তামাসা শুরু করছে।  অতীতের মতো এসব নাটক কাহিনী করে আবারও একটি চুরি ডাকাতির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে চায় তারা। আর সেটাই বাস্তবায়নের দায়িত্ব হলো তথাকথিত এই নির্বাচন কমিশনের।  কাজেই এ নিয়ে বিএনপির কোনো মাথা ব্যথা নেই।  নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা যে নির্বাচন কমিশন আসার পর তারা যে নির্বাচন কমিশন গঠন করবে সেই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আমরা আলোচনায় বসবো।

গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়কারী রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম বলেন, ‘আমরা যে যুগপৎ ধারায় আন্দোলন করছি, সেই যুগপৎ ধারায় আন্দোলনকে সারা দেশের সব রাজনৈতিক দল, যারা এই সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় না, নির্বাচনের আগে তার পদত্যাগ চায়, তারপর নির্বাচনের পর দেশ কোন পথে পরিচালিত হবে, কোন ধরনের সরকার ব্যবস্থা হবে, কোন শাসন ব্যবস্থায় দেশ পরিচালনা করবো এগুলো নিয়ে যে যৌথ ঘোষণার কথা বলছি।  সেই যৌথ ঘোষণার বিষয়ে আমরা বিএনপির সঙ্গে কথা বলেছি।’

এদিকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার নয়, ব্যালটের মাধ্যমেই ৩০০ আসনে ভোট হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সোমবার (৩ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের সম্মেলন কক্ষে কমিশনের ১৭তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।  বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল।

সভা শেষে ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলম এ তথ্য জানিয়ে বলেন, আগামি সংসদ নির্বাচনে ইভিএমে ভোট না হলেও স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ইভিএমে ভোট হবে। নির্বাচনের আগে সময় স্বল্পতা ও অর্থমন্ত্রণালয় থেকে অর্থ পেতে নিশ্চয়তা না পাওয়া এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে যে ঐক্যমতের অভাব; এ তিন কারণে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব আরও বলেন, ইসির কর্মপরিকল্পনায় সর্বোচ্চ ১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল।  কিন্তু ইভিএম মেরামতের জন্য প্রায় ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা প্রয়োজন।  সেই টাকা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে চাওয়া হয়।  কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় অপারগতা প্রকাশ করেছে।  যেহেতু সব ইভিএমই মেরামত করতে হবে সে পরিমাণ অর্থ নির্বাচন কমিশনের কাছে নেই। এ ছাড়া বিষয়টি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

এসময় আরও পাঁচটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হয়।  এসব সিটি করপোরেশন হলো, গাজীপুর, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও খুলনা। আগামী ২৫ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন, রাজশাহী ও সিলেটে ২১ জুন, খুলনা ও বরিশালে ১২ জুন ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশন গত বছর ফেব্রæয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বিভিন্ন অংশীজন ও প্রযুক্তিবিদদের সঙ্গে বৈঠক করে সর্বোচ্চ ১৫০ আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়।  যদিও এ সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করছিল বিএনপিসহ বেশকিছু রাজনৈতিক দল।

নির্বাচন কমিশন তার রোডম্যাপে এ সিদ্ধান্ত অন্তর্ভূক্ত করার পর দুই লাখ ইভিএম কেনার জন্য সরকারের কাছে নতুন একটি প্রকল্প প্রস্তাব দেয়।  ৮ হাজার ৭১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার ওই প্রকল্প প্রস্তাবটি বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের কারণ দেখিয়ে সরকার আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত জানায়।  এরপর নির্বাচন কমিশন হাতে থাকা দেড় লাখ মেশিন মেরামতের জন্য ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা চায়।  সেই অর্থও চলতি বছর দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানায় সরকার।  এক্ষেত্রে আগামী অর্থ বছরের এই অর্থ দেওয়ার কথা বলে অর্থ মন্ত্রণালয়।

এদিকে ইভিএম মেরামতের জন্য এখনই অর্থ না পাওয়া গেলে সংসদ নির্বাচনের আগে হাতে থাকা মেশিনগুলো ব্যবহার উপযোগী করে তোলা সম্ভব নয় বলে জানায় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ)।  কেননা, চলতি বছর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ অথবা আগামি জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।  এ অবস্থায় বৈঠক ডেকে ইভিএম মেশিন আগামী সংসদ নির্বাচন ব্যবহার করা থেকে সরে এলো নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থাটি।

এক এগার সরকারের সময়কার ড. এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন ভোটে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে ইভিএমের প্রচলন শুরু করে।  সে সময় তারা বুয়েটের কাছ থেকে মেশিন তৈরি করে নেয়।  ওই কমিশনের পরিকল্পনা ছিল স্থানীয় নির্বাচনে মেশিনটি ব্যবহার করে জনপ্রিয়তা অর্জনের পর ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের।

শামসুল হুদা কমিশনের পর কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন কমিশন এসে বুয়েটের তৈরি সেই মেশিন আর সফলভাবে ব্যবহার করতে পারেনি।  ২০১৫ সালে রাজশাহী সিটি নির্বাচনে একটি মেশিনে সমস্যা দেখা দিলে ব্যাপক বিড়ম্বনায় পড়তে হয় তাদের।  ফলশ্রুতিতে বুয়েটের তৈরি ওই মেশিন নষ্ট করে আরও উন্নতমানে ইভিএম তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন।  পরবর্তীতে কেএম নূরুল হুদার কমিশন এসে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০০ আসনে মেশনটি ব্যবহারের লক্ষ্যে বিএমটিএফের কাছ থেকে প্রায় ২০ গুণ বেশি দামের দেড় লাখ ইভিএম তৈরি করে নেয়।  এরই মাঝে সেই মেশিনগুলোর মধ্যে ৪০ হাজার একেবারে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।