ইমরান বঙ্গবন্ধু আর পিটিআই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ!

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতা ইমরান খানের সাম্প্রতিক এক বক্তব্য ব্যাপক আলোচনা ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।  ইমরান তার সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলনকে তুলনা করেছেন ১৯৭০-৭১ সালে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আন্দোলনের সঙ্গে।  আর পিটিআই’কে তুলনা করেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, তিনি এমন কিছু কথা বলেছেন, যা পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের মুখে সাম্প্রতিককালে শোনা যায়নি।

ইমরান বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে গিয়েছিল, কারণ একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট পেলেও, তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার অধিকার দেওয়া হয়নি।  তৎকালীন পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা ও পরবর্তীকালের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত জুলফিকার আলি ভুট্টোর প্রতি ইঙ্গিত করে সাবেক ক্রিকেটার বলেন, একজন চতুর ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ তৎকালীন নির্বাচনে বিজয়ী বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের (আওয়ামী লীগ) বিরুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছিল, যার ফলে দেশ দু-টুকরো হয়ে যায়।

ইমরান বলেন, ‘১৮ বছর বয়সে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ১৯৭১ সালে খেলতে গিয়েছিলাম পূর্ব পাকিস্তানে।  পাকিস্তানের গণমাধ্যমের ওপর তখন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।  আমার জানা ছিল না, সেখানকার মানুষের ভেতরে কী পরিমাণ ঘৃণা জমেছিল।  কেন ঘৃণা জমেছিল!  তারা নির্বাচনে জিতেছিল আর আমরা তাদের সেই অধিকার দিচ্ছিলাম না।  প্রধানমন্ত্রী তাদের হওয়ার কথা।  কিন্তু আমরা এখানে (পশ্চিম পাকিস্তানে) বসে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা তাদের প্রধানমন্ত্রী হতে দেব না।’

পাকিস্তানে এখনো ১৯৭১’র ঘটনাবলীকে ‘ভারতের ষড়যন্ত্র’ বলে তুলে ধরা হয়।  কিন্তু ইমরান খান বলছেন, তখন যা ঘটেছিল এবং এখন যা ঘটছে তার জন্য সামরিক বাহিনীই দায়ী।  তারা ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবকে বঞ্চিত করেছিল এবং এখন তাকে অর্থাৎ ইমরান খানকে বঞ্চিত করছে।

তিনি বলেন, এখন নওয়াজ শরিফ এবং আসিফ জারদারি একই ধরনের ভূমিকা পালন করছেন।  তারা চেষ্টা করছেন, এস্টাব্লিশমেন্টের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে পিটিআই’র ক্ষমতায় ফেরার পথ আটকে দিতে।

ইমরান খান বলে আসছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই পেছন থেকে কলকাঠি নেড়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে।  বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকারকেও তিনি ‘ইমপোর্টেড’ বা আমদানিকৃত সরকার বলে থাকেন।

পাকিস্তানের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মানসুর মালিক বলেন, সম্প্রতি সামরিক বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইমরান খান আরও বেশি আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিচ্ছিলেন।  বিশেষ করে, আরশাদ শরিফ নামে একজন সাংবাদিকের হত্যাকাণ্ডের পর তার কথাবার্তার প্রেক্ষাপটে আইএসআইএ প্রধান এক সংবাদ সম্মেলন করেন।  পাকিস্তানের ইতিহাসে এর আগে কখনো এমনটি ঘটেনি।

মানসুর বলেন, ইমরান খান নিজেকে তুলনা করছেন শেখ মুজিবের অবস্থানের সঙ্গে, আর শাহবাজ শরিফ ও আসিফ আলি জারদারিকে তুলনা করছেন জুলফিকার আলি ভুট্টোর সঙ্গে।

কিছুদিন আগে পিটিআই ত্যাগকারী এক নেতা বলেছিলেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীই ‘ইমরান খানকে তৈরি করেছে এবং তাকে ক্ষমতায় এনেছে।’

কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিন যেতে না যেতেই সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ইমরান খানের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে।  কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, ২০২১ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের একটি গোয়েন্দা সংস্থার নতুন প্রধানের নিয়োগ অনুমোদন করে সই দিতে অস্বীকার করেছিলেন ইমরান খান।  এটি তার সামরিক বাহিনীর সমর্থন হারানোর একটি কারণ।

লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক এবং পাকিস্তানের রাজনীতির বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, পাকিস্তানের সমাজে একটি শিক্ষিত ও বুদ্ধিবৃত্তিক অংশ রয়েছে, যারা ১৯৭০-৭১ সালে যা ঘটেছিল তাকে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের আলোকেই দেখেন।  তবে ইমরান খান এখন একে ভিন্নভাবে তুলে ধরতে চাইছেন তার নিজের সুবিধার জন্যই।