মিরসরাইয়ে ইজ্জত বাঁচাতে তিন ছাত্রলীগ নেতাকে বহিষ্কার

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে স্কুলছাত্রীকে যৌন হেনস্তা ও তার মা-বাবাকে হত্যার হুমকি দিয়ে গ্রেফতার হওয়া তিন ছাত্রলীগ নেতাকে বহিষ্কার করেছে উপজেলা ছাত্রলীগ।

সোমবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে দলীয় প্যাডে উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক মাসুদ করিম রানা স্বাক্ষরিত একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বহিষ্কৃত তিন ছাত্রলীগ নেতা হলেন- ১১ নং মঘাদিয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সাজ্জাদ সাগর, গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক সালমান হোসেন ও একই ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রিফাত হোসেন। স্কুলছাত্রী যৌন হেনস্তার ঘটনায় আটককৃত এজাহার নামীয় অন্য আসামি এমরান হোসেন বাদশাকেও (২০) ও মো. সবুজ (২৩) ছাত্রলীগের কর্মী হলেও তাদের কোন পদ পদবি না থাকায় তাদের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

রবিবার (১৭ সেপ্টম্বর) দুপুরে ভুক্তভোগি স্কুল ছাত্রীর পিতার অভিযোগের ভিত্তিতে স্থানীয়দের সহায়তায় মিরসরাই থানা অফিসার ইনচার্জ কবির হোসেন নিতৃত্বে উপস্থিত অভিযান চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

সূত্রে জানা গেছে, বার্তা টুয়েন্টিফোর নামে একটি অনলাইন নিউজপোর্টালে ‘এমপিপুত্র রুহেলের কিশোর গ্যাংয়ের ৪ সদস্য গ্রেফতার’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে মিরসরাইয়ে চাঞ্চল্য ও আলোচনা-সমালোচনার জন্ম। এতে এমপিপুত্র রুহেলকে নিয়ে কানাঘুষা চলতে থাকে। পরে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে রুহেলের নির্দেশে মিরসরাই উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক উপজেলা ছাত্রলীগের প্যাডে তিনজনেক বহিষ্কার করে দ্রুত তার প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।

এর আগে ওই স্কুলছাত্রীর বাবা তিন ছাত্রলীগ নেতাসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মিরসরাই থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। রবিবার দুপুরে স্কুলছাত্রীর মায়ের গতিপথ আটকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার পর স্থানীয়দের সহায়তায় তাৎক্ষণিক তাদের গ্রেফতার করে পুলিশ।

জানা গেছে, চলতি বছরের ১২ মে বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে সাধুরবাজার এলাকায় সবুজ (২১) ও শুভ (১৯) নামের দুই বখাটে মলিয়াইশ উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির তানিয়া (ছদ্মনাম) ছাত্রীকে জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় চুল ধরে টানাটানির এক পর্যায়ে ওই ছাত্রীর মাথার স্কাফ খুলে ফেলে তারা। গাড়িতে তুলতে ব্যর্থ হওয়ার পর গাড়ি দিয়ে চাপা দেয়ারও চেষ্টা করে তারা। পরে শিক্ষার্থীদের চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে আসলে বখাটেরা গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যায়। তখন সহপাঠিরা ওই শিক্ষার্থীকে বাড়ি নিয়ে যায়। ঘটনার দিন বিকালে মিরসরাই থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেন ভুক্তভোগী কিশোরীর বাবা বেলায়েত হোসেন। অভিযোগের পর পুলিশ সবুজ নামের একজনকে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করে। আরেকজন আদালতে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। জামিনে এসে সবুজ ও শুভ দলবল নিয়ে বাড়ির আশেপাশে এসে ঘরের চালে ঢিল ছুড়ে এবং স্কুলছাত্রীকে তুলে নেওয়ারও হুমকি দেন। বখাটেদেরে ভয়ে দীর্ঘ ৪ মাস স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। এ নিয়ে বিভিন্ন গনমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের উপর উপজেলা প্রশাসন মেয়ের বাড়িতে গিয়ে মেয়েকে আশস্ত করে আবার স্কুলে যাওয়ার জন্য।

মিরসরাই উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও থানা প্রশাসনের সহায়তায় সোমবার (১৭ সেপ্টম্বর) সকালে ওই স্কুল ছাত্রীর মা আকলীমা আক্তার তার মেয়েকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যান। মেয়েকে বিদ্যালয়ে দিয়ে বাড়ি ফেরার পথেই সকাল ১০টার দিকে মঘাদিয়া ইউনিয়নের সাধুর বাজার সিএননি স্ট্যান্ড পৌঁছলে শুভ ও সবুজের নেতৃত্বে কিশোর গ্যাংয়ের ৭ থেকে ৮ জন দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে তার পথ রোধ করে। এ সময় তারা আকলিমা আক্তারকে তাদের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নেয়ার হুমকি দেয়, অন্যথায় হত্যা করার হবে বলে জানায়।

তারা আকলিমা আক্তারকে হত্যার হুমকি দিয়ে দাম্ভিকতার সঙ্গে বলে- বর্তমানে হত্যা করা হলেও ১ মাসের মধ্যে জামিন পাওয়া যায়। তাই বাড়াবাড়ি না করে ভালোয় ভালোয় যেন তাদের বিরুদ্ধে করা সকল অভিযোগ থানা ও আদালত থেকে তুলে নেয়া হয়। বিষয়টি কিশোরীর বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানতে পেরে থানায় খবর দিলে স্থানীয় সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় থানা পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে ৪ জনকে আটক করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসাইন মাস্টার জানান, তারা ছাত্র রাজনীতি করে, আমি এলাকার চেয়ারম্যান হিসেবে রাজনৈতিক নেতা কর্মীরা আমাকে অনুসরণ করে। কিন্তু আমি কোনো অন্যায় কাজকে সমর্থন করি না।

এ বিষয়ে উপজেলা ছাত্রলীগের আহবায়ক মাসুদ করিম রানা জানান, মিরসরাই উপজেলা ছাত্রলীগের এক জরুরি সিদ্ধান্ত মোতাবেক দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে মঘাদিয়া ইউনিয়নের তিনজনকে তাদের স্ব স্ব দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ছাত্রলীগ একটি পরিচ্ছন্ন সংগঠন। কোনো অন্যায়, অপরাধকে প্রশ্রয় দেয় না।

মিরসরাই থানা অফিসার ইনচার্জ জানান, বখাটেদের পূর্বেও একই ঘটনায় গ্রেফতার করে হাজতে পাঠানো হয়েছিল। তারা জামিনে এসে পুনরায় স্কুল ছাত্রীর বাড়িতে গিয়ে হুমকি দেয় ও সর্বশেষ তার মায়ের গতিপথ রোধ করে ধারালো অস্ত্র পদর্শন করে হত্যার ইঙ্গিত দেয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ফোন পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে ৪ জনকে আটক করতে সক্ষম হই। তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজা জেরীন জানান, বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় এমপি মহোদয়কে অবহিত করা আছে। তবে বিষয়টি নিয়ে অনেকেই মোবাইল কোর্ট করার পক্ষে থাকলেও সেটি নানা কারণে সম্ভব হয়নি।

দেশ বর্তমান/এইউ/এআই