‘ও আল্লাহ গো আমার কইলজার টুকরারে তুমি কই নিয়া গেলা। তুমি আমারেও নেওগা গো। স্বর্ণের চাক্কা বাবারে ছাড়া আমি কেমনে থাকমু।’ ছেলে রেজাউলের মৃত্যুর সংবাদ শুনে মা রেনু বেগমের এমন আহাজারি শুনে প্রতিবেশীরা চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
শুক্রবার রাজধানীর গুলিস্থানে আওয়ামী লীগের দুই নেতার অনুসারীর সংঘর্ষে নিহত হন পথচারী হাফেজ রেজাউল (২১)। তিনি শেরপুরের নকলা উপজেলার চরঅষ্টাধর ইউনিয়নের নারায়ণখোলা পশ্চিমপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুস সাত্তারের বড় ছেলে। রেজাউল ঢাকার যাত্রাবাড়িতে একটি মাদ্রাসায় দাওরা হাদিস বিভাগের ছাত্র ছিলেন।
শনিবার সকালে নকলা থানা পুলিশ রেজাউলের বাবা-মাকে তার মৃত্যুর খবর দেন এবং ঢাকায় গিয়ে লাশ গ্রহণ করে নিজ বাড়িতে আনার অনুরোধ করেন। হঠাৎ ছেলের মৃত্যুর খবরে বাকরুদ্ধ হয়ে যান বাবা-মা। পরিবারে শুরু হয় শোকের মাতম।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একেবারেই নম্র-ভদ্র সদালাপী রেজাউল কোনোদিন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। তার তিন বোন। ময়মনসিংহ জামিয়া ফয়জুর রহমান মাদ্রাসা থেকে পড়া শেষ করে তিনি ঢাকায় দাওরা হাদিস বিভাগে ভর্তি হন।
নিহত রেজাউলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বাবা আব্দুস সাত্তার ছেলের মৃত্যুর সংবাদ শুনে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। প্রতিবেশী ও স্বজনরা শরীরে পানি ছিটিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করছেন।
ছেলের কথা বলতে গিয়ে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বলতে থাকেন, ‘কি হইল, কিছুই বুঝবার পারতাছি না। কত কষ্ট কইরা লেহাপড়া (লেখাপড়া) করাইতাছি। গতকাইল মোবাইলে কথা হইল। আইজ সকালে শুনি বাপ আমার নাই। আমার বাপের কি দোষ। ও তো কোনো দল করত না। তাইলে কেন অরে মারল। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করি, আমার পোলারে যারা মারছে আপনে তাদের ন্যয্যবিচার করবেন।’
চরঅষ্টাধর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সোহেল রানা বলেন, রেজাউল সহজ সরল ছিল। সবাই তাকে খুব ভালোবাসতো। কোনোদিন কোনো দলের সঙ্গে জড়িত ছিল না।
প্রতিবেশী ও আত্মীয় রাজন মিয়া বলেন, সবসময় হাসিখুশি রেজাউল কোনো সাতে-পাঁচে ছিলেন না। তার ছোট ভাইও একজন হাফেজ। রাজনীতি করতেন না। রোজার মাসে স্থানীয় মসজিদে খতম তারাবি পড়ান। বোরবানি ঈদে বাড়ি আসেন। কয়েকদিন পর ঢাকায় চলে যান। অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করতেন তিনি।
নকলা থানার ওসি রিয়াদ মাহমুদ বলেন, ‘পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুক্রবারের ঘটনায় পশ্চিম নারায়ণখোলা গ্রামের রেজাউল মারা গেছেন। তার মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আছে। সেই লাশ গ্রহণের জন্য তার পরিবারের সদস্যদের খবর দিন। আমরা সকালে মৃত্যুর খবর জানিয়ে লাশ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করি। স্বজনরা তার লাশ আনার জন্য ঢাকায় গেছেন।’