দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিকে রাজপথে ও নির্বাচনে মোকাবেলায় নতুন কৌশল নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। কূটনীতিকদের নানা তৎরতায় আগামী নির্বাচন কিছুটা কঠিন হতে পারে বলে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ আগেভাগে তা মোকাবেলার তৎপরতা শুরু করতে চাচ্ছে। জানা গেছে, ১৪ দলের বাইরে থাকা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সরকার সমর্থক ছোট ছোট রাজনৈতিক দলকে নিয়ে বিএনপির মতো একাধিক পৃথক জোট গঠন করা হতে পারে। সমমনা এই রাজনৈতিক দলগুলো বিএনপি ও তাদের মিত্রদের মোকাবিলায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকবে রাজপথে এবং তারাও ক্ষমতাসীনদের কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করবে এবং নির্বাচনেও অংশ নেবে। আগামী সেপ্টেম্বরে এই জোট গঠনের কাজ শুরু হতে পারে বলে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে বিএনপির ভোটে অংশগ্রহণ করা না করার ওপর।
গত বুধবার রাতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে ১৪ দলের নেতৃবৃন্দের এক সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন শেখ হাসিনা। তবে বৈঠকে ১৪ দলের নেতারা কোন ইসলামী দলকে জোটে না নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে। তাদেরকে আলাদা করে জোট গঠনে সমর্থন দেয়ার বিষয়টিকে জোর দেয়া হয়েছে। এছাড়াও আসন ভাগাভাগির বিষয়েও আগেভাগে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানিয়েছে ১৪ দল নেতারা। তাতে সায় আছে আওয়ামী লীগেরও।
বৈঠকে অংশ নেয়া ১৪ দলের শরীক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি দেশ বর্তমানকে বলেন, যারা ১৪ দলে আসতে চায় তাদেরকে সরাসরি জোটে না নিলেও তাদেরকে সমর্থন দেয়া হতে পারে। ১৪ দলীয় জোট একটি আদর্শিক জোট, তাই এ জোটে আর কোন দলকে না নেয়ার জন্য শরীকদের চাপ রয়েছে। তাই তাদেরকে আলাদা জোট করার পরামর্শ দানের কথা আলোচনা হলেও কিছুই চূড়ান্ত করা হয়নি।
১৪ দলীয় জোটের অপর শরীক জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরিন আক্তারের কাছে জানতে চাইলে তিনি দেশ বর্তমানকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের মধ্যে যারা আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখছে তাদেরকে নতুন জোটে রাখা হতে পারে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সমমনা একাধিক জোট হতে পারে।
জানা গেছে, আমির হোসেন আমু নিবন্ধন পাওয়া নতুন দুটি রাজনৈতিক দলকে ১৪ দলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেন।
সূত্রমতে, বিএনপি ও তাদের বলয়ে থাকা দলগুলো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলে এক রকমের কৌশল, আর ভোট বর্জন করলে অন্যরকম কৌশল নেবে আওয়ামী লীগ। বিরোধীরা নির্বাচনে এলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল সম্প্রসারণ এবং মহাজোট সক্রিয় করার চিন্তা করা হচ্ছে। যদি বিরোধীরা ভোটে না আসে, তাহলে ১৪ দল সম্প্রসারণ কিংবা মহাজোট সক্রিয় করা নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে, অথবা ইসলামি দলগুলো নিয়ে আলাদা জোট হতে পারে, তাতে সবুজ সংকেত দেওয়ার চিন্তা সরকারি দলের। তবে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বাম দলগুলোকেও কাছে পেতে চায় আওয়ামী লীগ। তাদের সাথে যোগাযোগও রাখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য, একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং দুই জন সাংগঠনিক সম্পাদক দেশ বর্তমানকে বলেন, সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সব রাজনৈতিক দলকেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। বিএনপি জোট নির্বাচনে এলে একরকম নির্বাচনি হিসাব, না এলে আরেকরকম হিসাব হবে। দুই ধরনের নির্বাচনি কৌশল নিয়েই এগোচ্ছে আওয়ামী লীগ। সেপ্টেম্বর অক্টোবরের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে যাবে নির্বাচনে কারা অংশ নেবে, আর কারা নেবে না। ফলে তখন নির্বাচনি কৌশলও প্রকাশ্য রূপ লাভ করবে।
তারা বলছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর পাশাপাশি সমমনা দলগুলোর সঙ্গে পর্দার আড়ালে যোগাযোগ রাখছে আওয়ামী লীগ। বিশেষ করে যেসব দল বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচনে আসতে আগ্রহী, সেই দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ১৪ দল বা মহাজোটে যুক্ত হতে চায় কিছু ইসলামি দলসহ বেশ কয়েকটি দল, সেগুলোকে বিশেষ বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তবে ১৪ দলের শরিকরা ইসলামি দলকে জোটে নেওয়ার বিপক্ষে থাকায় আগ্রহী দলগুলোকে নিয়ে আলাদা জোট গঠনের ক্ষেত্রে সবুজ সংকেত রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘১৪ দলের কলেবর বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সমমনা দল, পেশাজীবীদের যুক্ত করা হতে পারে। আওয়ামী লীগ নিজস্ব প্রক্রিয়ায় নির্বাচনি প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যরাও তাদের মতো করে নির্বাচনি প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ধর্মভিত্তিক ১০টি দল হচ্ছে জাকের পার্টি, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ও খেলাফত মজলিস। এরমধ্যে তরিকত ফেডারেশন ১৪ দলের শরিক। বাকিদের মধ্যে ১৪ দলে যুক্ত হতে চায় মিছবাহুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশ, সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদীর নেতৃত্বাধীন ইসলামিক ফ্রন্ট ও আতাউল্লাহ হাফেজ্জীর নেতৃত্বাধীন খেলাফত আন্দোলন।
১৪ দলের সূত্রমতে, গত ১৩ মার্চ জোটের সমন্বয়ক এবং আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামিক ফ্রন্ট ও খেলাফত আন্দোলনের নেতারা। তারা ১৪ দলীয় জোটে যুক্ত হওয়ার আগ্রহের কথা সমন্বয়ককে জানিয়েছেন। একই দিনে অনুষ্ঠিত ১৪ দলের বৈঠকে বিষয়টি তোলেন আমু। এ সময় ১৪ দলের শরিক নেতারা তাদের ‘আদর্শিক’ জোটে ইসলামি দলকে নেওয়ার ব্যাপারে আপত্তি জানান। এমনকি জোটে থাকা একমাত্র ধর্মভিত্তিক দল তরিকত ফেডারেশনও নতুন করে কোনও ইসলামি দলকে জোটে নেওয়ার বিরোধিতা করে।
বিরোধিতার বিষয়টি স্বীকার করে ওই দিন আমির হোসেন আমু সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমাদের সঙ্গে ইসলামি অনেক দল জোট করতে চায়। আমরা বলেছি ১৪ দল একটা আদর্শিক জোট। এখানে অন্য কোনও ইসলামি দলকে নেওয়া সম্ভব নয়। তারা আলাদাভাবে জোট গঠন করলে, তাদের প্রতি আমাদের সমর্থন বা সরকারের সমর্থন থাকবে। তারা আমাদের কর্মসূচিতে এলো, আমরাও গেলাম বা প্রতিনিধি পাঠালাম।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘ইসলামি দলগুলো আলাদাভাবে বা জোট করে নির্বাচনে এলে তাদের আমরা সাধুবাদ জানাই। তারা কীভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে, সেটি তাদের নিজস্ব প্রক্রিয়ার বিষয়। তবে ১৪ দল আদর্শিক জোট হওয়ায় এর আকার আগামীতে বাড়লেও ইসলামি দলগুলোর যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেখছি না।’
জানা যায়, কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও সম্প্রতি নিবন্ধন পাওয়া প্রয়াত ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার গঠন করা তৃণমূল বিএনপিও ১৪ দলে আসতে আগ্রহী। এরমধ্যে গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে সপরিবারে সাক্ষাৎ করেন কাদের সিদ্দিকী। আর ২০১৫ সালের ২০ নভেম্বর গঠিত তৃণমূল বিএনপি চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি ‘সোনালী আঁশ’ প্রতীকে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পায়। নাজমুল হুদার মেয়ে অন্তরা সেলিমা হুদা দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। ১৪ দলীয় জোটে আসতে আগ্রহী দলের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের নামও। তবে এ বিষয়ে দল তিনটির কেউই কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।