পুলিশের ওপর হামলা করে আদালত চত্বর কিংবা প্রিজনভ্যান থেকে আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনা নতুন নয়। বিশেষ করে আদালতে হাজিরা বা কারাগারে আনা-নেওয়ার পথে দেশের কোথাও না কোথাও এমন ঘটনা ঘটছেই। তাই আসামি আনা-নেওয়ার ঝুঁকি এড়াতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারে একটি আইনের খসড়া প্রনয়ন করে আইন কমিশন। ২০২১ সালের ৩০ ডিসেম্বর এই আইনটির খসড়ার ফাইনাল রিপোর্ট আকারে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু দীর্ঘ এক বছর পেরিয়ে গেলেও আইন কমিশনের ওই সুপারিশ কার্যকরের কোনো উদ্যোগ নেই।
জানা গেছে, নতুন এই আইনে বিভিন্ন প্রযুক্তি বিষয়ক শব্দসমূহ যেমন ‘অডিও-ভিজ্যুয়াল কনফারেন্স, আদালত প্রান্ত, ইলেকট্রনিক রেকর্ড, ইলেকট্রনিক বিন্যাস, উপাত্ত, কর্তৃপক্ষ, ডিজিটাল সাক্ষ্য, দলিল, দূরবর্তী প্রান্ত, দৃশ্যমান উপস্থিতি, ব্যক্তিগত উপস্থিতি সহ অন্যান্য শব্দের সংজ্ঞাসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিচার কার্যক্রমে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২২ এর খসড়া প্রণয়নের আগে সাক্ষ্য আইন ও বিচারকাজের সাথে সর্ম্পকিত দেশের প্রচলিত আইনসমূহ পর্যালোচনা করেছে আইন কমিশন। পাশাপাশি এই সংক্রান্ত বিভিন্ন দেশের আইনসমূহ বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্যের আইনসমূহ পর্যালোচনা করা হয়।
তাছাড়াও এ বিষয়ে দেশী ও বিদেশী গবেষক এবং বিশেষজ্ঞদের সাথেও মতবিনিময় করা হয়েছে। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক এবং কমিশনের সদস্য বিচারপতি এ. টি. এম ফজলে কবির-এর সার্বিক তত্ত্ববধানে খসড়া আইনটি তৈরি করা হয়েছে।
কমিশনের যুক্তিতে বলা হয়েছে, হাইপ্রোফাইল আসামীদের আদালতে আনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকে। কারণ প্রকাশ্যে প্রিজন ভ্যানে গুলি চালিয়ে ও বোমা মেরে আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে অতীতে। সাক্ষী বা মোকদ্দমা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ অনেক সময় প্রভাবশালী বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের দ্বারা ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারনে আদালতে উপস্থিত হতে পারেন না। একই দিনে ক্ষেত্র বিশেষে পৃথক দুটি আদালতে মামলা থাকে একই ব্যক্তির। এ ছাড়া মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সহ গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা দূরে থাকলে সাক্ষী দিতে আদালতে উপস্থিত হতে না পারলে মামলার বিচারকাজ ব্যাহত হয়। সে ক্ষেত্রে দুরবর্তী কোন স্থানে অবস্থানরত মোকদ্দমার কোন পক্ষ, সাক্ষী, অভিযুক্ত ব্যক্তি, আইনজীবী, বিশেষজ্ঞ বা মোকদ্দমার সংশ্লিষ্ট কোন ব্যক্তি তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে অডিও-ভিজ্যুয়াল সংযোগের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করতে পারবেন।
আইন কমিশনের মতে, বৃটিশ ভারতে আদালতে ফৌজদারী ও দেওয়ানী বিচারপদ্ধতি পরিচালনার জন্য ও সাক্ষীর মৌখিক ও দাখিলকৃত তথ্যের পরীক্ষণ, অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি, তথ্যের গ্রহণ বা বর্জনের মূল সূত্র, প্রমাণের দায়ভার নির্ণয় এবং বিষয়ের প্রাসঙ্গিকতা নির্ধারণ করার লক্ষ্যে ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে দি এ্যাভিডেন্স এ্যাক্ট ১৮৭২ এর প্রবর্তন করা হয়। বর্তমানে ১৫০ বছরের এই পুরনো আইনটি তার যৎসামান্য পরিবর্তন ও সংযোজনসহ প্রচলিত আছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই শতাব্দী প্রাচীন আইনটি বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির দ্বারা পরিবর্তিত ও সৃষ্ট অপরাধের বিচারকার্য পরিচালনা করা দূরূহ হয়ে পড়েছে যা আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। বর্তমান সাক্ষ্য আইনটি দ্বারা তথ্যপ্রযুক্তির ফলে সৃষ্ট সুবিধাসমূহও আদালত কার্যক্রমে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
আইন কমিশন বর্তমানে প্রচলিত সাক্ষ্য আইনের পাশাপাশি বিচার কার্যক্রম সহজ করার লক্ষ্যে আরেকটি ব্যবহারিক বা পদ্ধতিগত সাক্ষ্য আইন, যথা বিচার কার্যক্রমে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২২ প্রণয়নের লক্ষ্যে সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদন প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। সেই লক্ষ্যে এই আইনটির সুপারিশ করেছে।
এতে বলা হয়েছে, বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমের সহজলভ্য ও সুলভতার কারনে যে কোন ব্যক্তি তার ঘরে অবস্থান করেই মুঠোফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে দেশ বা বিদেশের যে কোন প্রান্তে যোগাযোগে সক্ষম যা বিগত অতিমারির ক্ষেত্রেও প্রমাণিত হয়েছে। অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের তথ্য প্রযুক্তি খাতে সক্ষমতাকেও প্রমাণ করেছে। এসব সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের বিচার কার্যক্রম পরিচালনায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার তথা আধুনিক বিচারব্যবস্থায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার দ্বারা সাক্ষ্য গ্রহণসহ অন্যান্য বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে আইন কমিশন বিচার কার্যক্রমে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২২ এর খসড়া প্রণয়নের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রচলিত সাক্ষ্য আইনে “দূরবর্তী প্রান্ত’’ হতে সাক্ষ্য বা উপস্থিতি গ্রহন বা প্রদান নিশ্চিতকরণের বিধান নেই। প্রচলিত সাক্ষ্য আইনে সাক্ষ্য উপস্থাপন, প্রমাণ বা সাক্ষী ও পক্ষগণের ব্যক্তিগত উপস্থিতি গ্রহণ বা প্রদান নিশ্চিতকরণের বিধানাবলী সময় ও খরচ সাপেক্ষ যা বর্তমান মামলাজটেরও অন্যতম প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশন আরও বলেছে, বিচার কার্যক্রমে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যাবহার আইন- ২০২২, বর্তমান আধুনিক বিচার ব্যাবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্নমুখি ব্যবহারের দ্বারা বিচার ব্যবস্থায় আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রধান সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। পাশাপাশি বিচারকাজে গতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
আইন কমিশনের সদ্দিচ্ছা থাকা সত্বেও বিভিন্ন কারনে বর্তমানে আদালতে তথ্য প্রযুক্তি ব্যাবহার করে বিচার কার্যক্রমে চলমান আছে এরূপ কোন আধুনিক রাষ্ট্রে পরিদর্শন করে তা সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হয়নি। এর প্রেক্ষিতে এই খসড়া আইনে প্রয়োগিক কিছু ভুল পরিলক্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা স্বাভাবিক। তবে সেক্ষেত্রে এই খসড়া আইনটিকে একটি টেষ্ট কেস হিসেবে বাস্তবায়ন করা হলে প্রায়োগিক বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা প্রত্যক্ষ করে আইনটিকে ভবিষ্যতে আরো সমৃদ্ধ করা সম্ভব হবে। এই আইনটি প্রনয়ন ও কার্যকর হলে বাংলাদেশের বিচার ব্যাবস্থাকে সহজলভ্য, স্বল্পব্যয়ী, দ্রুত ও আধুনিক করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সময় ও খরচ কমিয়ে মামলাজট কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় ১৫০ বছর সাক্ষ্য আইনের সংস্কার না হওয়ায় এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা না থাকায় বিচারকাজ পরিচালনায় নানা সমস্যা হচ্ছে। কোনো মামলায় সাক্ষীদের বারবার সাক্ষ্য গ্রহণের প্রক্রিয়ায় এবং গরহাজিরার কারণে অনেক মামলার বিচার নিষ্পত্তিতে দেরি হচ্ছে। ফলে আদালতে মামলাজট বাড়ছে এবং বিচারপ্রার্থীরাও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। তাদের মতে, ১৮৭২ সালে প্রণীত সাক্ষ্য আইন মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে তা সাক্ষীদের সুরক্ষা যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে পারছে না। তাই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সাক্ষ্য আইনে পরিবর্তন আনা জরুরী হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি দ্রুত বিচার সম্পন্ন এবং ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে ডিজিটাল সাক্ষ্যপ্রমাণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আইনজীবীরা বলছেন, বিচারিক আদালতে যে কোনো মামলায় সাক্ষীর গড় হাজিরা মামলা নিষ্পত্তিতে বড় অন্তরায়। প্রস্তাবিত আইনটি কার্যকর হলে আদালতের দুরবর্তী প্রান্ত থেকে সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে পারবেন। এছাড়া মামলার সাক্ষী যদি সরকারি চাকরিজীবী হয়ে থাকেন, তাহলে তার কর্মস্থলে বসেই ডিজিটাল মাধ্যমে শুনানিতে অংশ নিতে পারবেন। পাশাপাশি স্পর্শকাতর মামলার আসামিরা কারাগারে বসেই প্রযুক্তির মাধ্যমে শুনানিতে অংশ নিতে পারবেন। তাদের আদালতে আনার ঝুঁকি থাকবে না। আইনটি কার্যকর হলে বিচারকাজে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে বলে তারা মনে করেন।