প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে যা করে দেখিয়েছে কেপ ভার্দে, তা এক কথায় ইতিহাস হয়ে থাকবে। দুইবার পিছিয়ে পড়ার পরও অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত ম্যাচ নিয়ে যাওয়া, গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার অনবদ্য সব সেভ; র্যাঙ্কিংয়ের ৬৭তম দলটি যেন রূপকথার নতুন গল্প লিখছিল। ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে হারলেও নাভিশ্বাস ছুটিয়ে ছেড়েছে আলবিসেলেস্তেদের।
মায়ামি স্টেডিয়ামে শেষ বত্রিশের ম্যাচে শনিবার (৪ জুলাই) কেপ ভার্দেকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে রাউন্ড অব সিক্সটিন নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ মিশর।
শনিবার (৪ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলতে থাকে কেপ ভার্দে। বলের দখল ধরে রেখে একাধিকবার আর্জেন্টিনার রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে আফ্রিকার দেশটি। অষ্টম মিনিটে রায়ান মেন্ডেসের শট এবং জোভানে কাবরালের নেতৃত্বে কয়েকটি আক্রমণে সতর্ক থাকতে হয় গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে।
শুরুর দিকে নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে পেতে কিছুটা সময় নেয় আর্জেন্টিনা। ১৬ মিনিটে প্রথম বড় সুযোগ পান লিওনেল মেসি। তবে তার শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। দুই মিনিট পর বক্সের বাইরে ফ্রি-কিক পেলেও মেসির শট সহজেই রুখে দেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া।
প্রথম ২৫ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনার আক্রমণ সফলভাবেই সামাল দেয় কেপ ভার্দে। কিন্তু ২৮ মিনিটে আবারও পার্থক্য গড়ে দেন মেসি। সতীর্থের দীর্ঘ পাস অসাধারণ দক্ষতায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বক্সের ভেতর থেকে জোরালো শটে বল জালে জড়িয়ে দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন অধিনায়ক।
এই গোলের মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা সাতে উন্নীত করেন মেসি। পাশাপাশি বিশ্বকাপে টানা অষ্টম ম্যাচে গোল করার কীর্তি গড়েন তিনি। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২০, যা আসরটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
গোল হজমের পরও ভেঙে পড়েনি কেপ ভার্দে। বিরতির আগে লাউতারো মার্তিনেজের চাপ এবং এনজো ফার্নান্দেজের দূরপাল্লার শট দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে ব্যবধান আর বাড়তে দেননি ভোজিনিয়া। ফলে ১-০ ব্যবধান নিয়েই প্রথমার্ধ শেষ করে আর্জেন্টিনা।
বিরতির পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে মাঠে নামে কেপ ভার্দে। ৫৪ মিনিটে ডেরয় দুয়ার্তের জোরালো শট দারুণ সেভে ফিরিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। এক মিনিট পর মেসির নিখুঁত পাস থেকে নাহুয়েল মোলিনা সুযোগ পেলেও বল নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন। ৫৬ মিনিটে মেসির নিশ্চিত গোলও অবিশ্বাস্য সেভে ঠেকিয়ে দেন ভোজিনিয়া।
অবশেষে ৫৯ মিনিটে সমতায় ফেরে কেপ ভার্দে। রায়ান মেন্ডেসের নিচু ক্রস ডিফেন্ডারের পায়ের ফাঁক গলে ডেরয় দুয়ার্তের কাছে পৌঁছালে কাছাকাছি কোণ থেকে জোরালো শটে এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে পরাস্ত করেন তিনি।
সমতায় ফেরার পর জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। ৬৩ মিনিটে মেসির একক প্রচেষ্টা, ৬৮ ও ৭১ মিনিটে তার দুটি ফ্রি-কিক; সবই অসাধারণ দক্ষতায় প্রতিহত করেন ভোজিনিয়া। শেষদিকে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, লিয়ান্দ্রো পারেদেস এবং মেসির আরও কয়েকটি প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয় কেপ ভার্দের গোলরক্ষকের দৃঢ়তায়। ফলে নির্ধারিত ৯০ মিনিট ১-১ সমতায় শেষ হয়ে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের তৃতীয় মিনিটেই আবার এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। কর্নার থেকে তৈরি হওয়া সুযোগে লাউতারো মার্তিনেজ জোরালো শটে বল জালে পাঠিয়ে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।
তবে কেপ ভার্দে আবারও দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। ১০২ মিনিটে সিডনি লোপেস কাবরাল বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত এক শটে এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে পরাস্ত করে ম্যাচে ২-২ সমতা ফেরান। টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোলের দাবিদার এই গোল নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়।
কিন্তু শেষ হাসি হাসে আর্জেন্টিনাই। ১১১তম মিনিটে মেসির নেওয়া কর্নার থেকে ক্রিস্তিয়ান রোমেরো দুর্দান্ত হেডে বল জালে জড়িয়ে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন দলকে।
পিছিয়ে পড়ার পরও শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায় কেপ ভার্দে। ১১৫ মিনিটে কাবরালের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক বিশ্বমানের সেভে ফিরিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। শেষ মুহূর্তে পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকেও নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জয় নিশ্চিত করেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত ১২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। তবে ফল যাই হোক, অভিষেক বিশ্বকাপেই বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়ে মাথা উঁচু করেই টুর্নামেন্ট শেষ করেছে কেপ ভার্দে।