আজ প্রখ্যাত সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী গোলাম মোস্তফার ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী

বিপ্লবী ছাত্রনেতা, সংগঠক, সাংবাদিক ও শহীদ বুদ্ধিজীবী আ ন ম গোলাম মোস্তফা। পর্যায়ক্রমে তিনি দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আজাদ এবং দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন। তৎকালীন সময়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারের সঙ্কলন গ্রন্থ অন্তরঙ্গ আলোকে সম্পাদনা করে বিশেষ সুনাম অর্জন করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অবরুদ্ধ ঢাকার বাঙালিরা যখন ভীতসন্ত্রস্ত, কথা বলত নিচু স্বরে তখনও তিনি স্বভাবসুলভ উচ্চস্বরে কথা বলতে ভালোবাসতেন। স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতেন। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন ছিল তাঁর অন্তরে। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে আত্মপ্রত্যয়ী ছিলেন।

১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের সময় দৈনিক আজাদ পত্রিকায় রাজনৈতিক কলাম লিখে সারাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার কলাম আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। অসাধারণ শ্রম, মেধা ও দক্ষতা দিয়ে দেশের সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের ভুবনকে সমৃদ্ধ করে গেছেন তিনি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন তিনি। এই অপরাধে ১৯৭১ সালের ১১ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহযোগী আল-বদর বাহিনী তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে হত্যা করে। তাঁর কর্মময় জীবন জাতিকে অনুপ্রাণিত করবে অনন্তকাল। আজ এই বুদ্ধিজীবীর ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যুবার্ষিকীতে গোলাম মোস্তফার জন্য আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

গোলাম মোস্তফা বাংলা ১৩৪৮ সালের ২৪ অগ্রহায়ণ দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জহিরউদ্দিন আহমেদ। গোলাম মোস্তফার শিক্ষাজীবন শুরু হয় দিনাজপুরের মেলাপাঙ্গা মাদ্রাসায়। সেখানে কিছুদিন পড়ার পর তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় দিনাজপুর জেলা স্কুলে। ১৯৫৮ সালে দিনাজপুর জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে ভর্তি হন সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। কিন্তু আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে তৎকালীন সময়ে দিনাজপুর শহরে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার কারণে জেলার তৎকালীন অধিকর্তা এবং সুরেন্দ্রনাথ কলেজের অধ্যক্ষ তার প্রতি বিরূপ ছিলেন। ১৯৬০ সালে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন এবং ১৯৬৩-তে একই কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রী অর্জন করেন। সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পাকিস্তান বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তিনি অন্যতম ছাত্রনেতার ভূমিকা পালন করেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের জেলা শাখার যুগ্ম-সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৬২-তে আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন সারা দেশে ছাত্রসমাজকে উদ্দীপ্ত করে তোলে, দিনাজপুরে সে আন্দোলন সংঘটিত করার ক্ষেত্রে গোলাম মোস্তফার ছিল ব্যাপক ভূমিকা। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হন। একটানা প্রায় আট মাস বিনা বিচারে কারাগারে আটক থাকেন। মুক্তি পাওয়ার পর পুনরায় ছাত্র আন্দোলনে দ্বিগুণ মাত্রায় সক্রিয় হয়ে উঠেন। ফলে পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ তাকে আবার গ্রেফতার করে।

পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে গোলাম মোস্তফা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং পরে সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দেন। প্রথমে তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন ‘দৈনিক সংবাদ’-এর বার্তা বিভাগে। কিছুদিন সংবাদে কাজ করার পর চলে যান ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায়। সেখানে তিনি সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি মাসিক ‘মোহাম্মদী’র সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করতেন। ১৯৬৯-এর আগস্ট মাসে ‘দৈনিক পূর্বদেশ’-এ সিনিয়র সাব-এডিটর হিসাবে যোগদান করেন। তিনি মৃত্যু পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত এখানেই কর্মরত ছিলেন। দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়ার সময়ই গোলাম মোস্তফা সাহিত্যচর্চার ব্যাপারেও আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সাহিত্যচর্চার জন্য দিনাজপুর শহরে তিনি ছিলেন পরিচিত মুখ। এ সময় তিনি স্থানীয় সাহিত্য আন্দোলনেরও নেতৃত্ব দেন। ‘অন্তরঙ্গ’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। গোলাম মোস্তফা রচিত দু’টি পুস্তকের মধ্যে আছে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার সম্বলিত ‘অন্তরঙ্গ আলোকে’ এবং অনুবাদ গ্রন্থ ‘শ্বেত কুণ্ডলা’।

১৯৭১ সালে অবরুদ্ধ বাংলায় গোলাম মোস্তফা সাহসিকতার সঙ্গে সাংবাদিকতা করে গেছেন। তখন তিনি ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকায় সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক ছিলেন। তিনি চাইতেন না, পূর্বদেশ পত্রিকায় পাকিস্তানিদের কোনো খবরাখবর যাক। শুধু পত্রিকায় লিখে নয়, ঢাকায় থেকেই তিনি তখন মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করছিলেন।

যুদ্ধাপরাধী ও পলাতক চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ১২তম সাক্ষী মুক্তিযুদ্ধকালে শহীদ সাংবাদিক আ ন ম গোলাম মোস্তফার ছেলে অনির্বাণ মোস্তফা। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী অনির্বাণ মোস্তফা বলেন, তিনি জেনেছেন, একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর রাতে তাঁর ঘুম হয়নি বলে পরদিন (১১ ডিসেম্বর) ভোরে তাঁকে নিয়ে তাঁর বাবা বারান্দায় হাঁটছিলেন। এ সময় তাঁর বড় মামা প্রকৌশলী শামসুজ্জোহাকে নিয়ে কয়েকজন একটি জিপে করে তাঁদের গোপীবাগের বাসায় এসে বাবাকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁর চাচা গোলাম রহমান বাবাকে খুঁজতে পূর্বদেশ পত্রিকায় গিয়ে বাবার সহকর্মী প্রধান প্রতিবেদক এহতেশাম হায়দার চৌধুরী ও আতিকুর রহমানকে বিষয়টি জানান। তাঁরা তখন মুঈনুদ্দীনকে ডেকে পাঠান ও তাঁর বাবাকে খুঁজতে বলেন। তাঁর চাচাকে সঙ্গে নিয়ে মুঈনুদ্দীন বিভিন্ন স্থানে যান। এর মধ্যে মোহাম্মদপুরে শারীরিক শিক্ষা ইনস্টিটিউটে গেলে সেখানকার প্রহরীরা মুঈনুদ্দীনকে দেখে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখান। সে সময় তাঁর বাবাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। দেশ স্বাধীনের পরও বিভিন্ন স্থানে খুঁজে তাঁকে পাওয়া যায়নি।