বিএনপিকে কোনো প্রকার ছাড় দিতে নারাজ আওয়ামী লীগ। রাজপথে মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়ে আগামী নির্বাচনের দিকেই এগুচ্ছে দলটি। বিদেশিদের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বার্তাকেও আমলে নেয়া হচ্ছে না।
সরকারের ঘনিষ্ঠ নানা সূত্রের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির সাথে আন্দোলনকারী দলগুলোকে নির্বাচনের বাইরে রেখে যারা বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে আগ্রহী, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলগুলোর সাথে যোগাযোগ বাড়ানো হচ্ছে।
বিদেশিদেরকে দেখানোর জন্য আওয়ামী লীগ, ১৪ দল ও জাতীয় পার্টির বাইরে আরো জোট করার তৎপরতাকে জোরদার করা হচ্ছে। একটি সূত্র বলেছে, অন্তত ১৫-২০ টি রাজনৈতিক দল সরকারের দায়িত্বশীলদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। তাদেরকে নিয়ে আলাদা আলাদা জোট করা হতে পারে।তবে শেষ মুহূর্তে বিএনপি নির্বাচনে এলে করণীয় কি হবে সেই কৌশলও ঠিক করে রেখেছে ক্ষমতাসীন দলটি।
গত কয়েক মাস ধরে বিদেশি কূটনীতিকরা আওয়ামী লীগ বিএনপি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে ধারাবাহিক বৈঠক করে আগামী দ্বাদশ নির্বাচনকে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে তাদের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছে। এতে করে বড় দুই দলের মধ্যে একটি সংলাপ বা সমঝোতার ভিত্তিতে এ নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনেকের প্রত্যাশার ভিত্তি গড়ে উঠে। কিন্তু গতকাল শুক্রবার সরকারের প্রভাবশালী কয়েকজন মন্ত্রী ও দায়িত্বশীল নেতাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সরকার বিদেশিদের তৎপরতাকে কোন প্রকার পাত্তা দিতে চাচ্ছে না।
ঈররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বিদেশিদের মন্তব্য গণমাধ্যমে অতিপ্রচারের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলে তারা মজা পান বলে জানিয়েছেন ।
তিনি বলেন, পৃথিবীর আর কোথাও অ্যাক্টিভিস্ট রাষ্ট্রদূতরা দলবেঁধে মন্তব্য করে বেড়ান না। তারা এদেশে নিজেদের সম্রাট মনে করেন। মন্ত্রী গতকাল শুক্রবার সিলেটে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৪০ জন মারা গেলো। একটা দেশও কথা বলেনি। আমাদের দেশে কে কী করলো সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার। এটি অভ্যন্তরীণ বিষয়ের ওপর হস্তক্ষেপ। যা জেনেভা কনভেনশনের ধারেকাছেও নেই। বাংলাদেশ দরিদ্র দেশ বলে তারা এটা করে।
এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আমাদের নির্বাচন হবে আমাদের নিয়মে, সংবিধানে যেভাবে লেখা আছে। এর বাইরে কারও চক্রান্তমূলক অভিলাষ বাস্তবায়ন হতে দেবে না আওয়ামী লীগ। তিনি গতকাল শুক্রবার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে দলের সম্পাদকমণ্ডলীর সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপির দাবি একটাই, শেখ হাসিনার পদত্যাগ। শেখ হাসিনার পদত্যাগ মানে সংবিধানের চরম লঙ্ঘন। আমরা সংবিধান লঙ্ঘন করতে পারি না।
বিশ্ব রাজনীতিতে অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বড় বড় নেতৃস্থানীয় দেশগুলোর মাথাব্যথা বাংলাদেশের মতো দেশ। দফায় দফায় বিদেশিরা আসছে, বিএনপিও দফা দিচ্ছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে বিএনপি কার সাথে আলোচনা করবে।
এদিকে তথ্যমন্ত্রী ড.হাছান মাহমুদ বলেছেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পাকিস্তানকে অনুকরণ করে নির্বাচনের দাবি করছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন হবে সংবিধানের আলোকে। বাংলাদেশের সংবিধানে আছে, নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হবেন পূর্ববর্তী সরকারের প্রধান। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান।
বিশ্বের কয়েকটি দেশের উদাহরণ টেনে মন্ত্রী বলেন, ওই সব দেশে নির্বাচনকালীন সরকার হয় এভাবে। বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় সংবিধানের এক চুলও ব্যত্যয় হবে না।
গতকাল শুক্রবার সকালে কুড়িগ্রামে জেলা আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় যোগদানের পূর্বে স্থানীয় সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী এসব মন্তব্য করেন।
এদিকে শুক্রবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক তাঁর নির্বাচনী এলাকার দলীয় এক সভায় বলেছেন, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাই। আর কখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার হবেও না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করেছেন। সুপ্রিম কোটের্র সিদ্ধান্ত মোতাবেক জাতীয় সংসদেও আইন পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করেছেন। ফলে বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’
আইনমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। এর শেকড় অনেক গভীরে। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে এই দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আপোষহীন ছিলেন। কখনো পাকিস্তানিদের সঙ্গে আপোষ করেননি। ‘তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এখন তারই সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান। তিনিও কারও অন্যায় আবদারের কাছে মাথা নত করেননি এবং করবেনও না’।
অন্যদিকে সরকারের পদত্যাগের এক দফার আন্দোলনে রয়েছে বিএনপি। দলটি এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন নয়, এই অবস্থানে অটল রয়েছে। বিএনপির এমন মনোভাব সম্পর্কে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করে, বিএনপি এক দফা দাবি তুলে আলোচনার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। সে জন্য বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচন করার পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছেন তাঁরা। বিএনপি নিজে থেকে না এলে তাদের নির্বাচনে আনার কোনো উদ্যোগ সরকার নেবে না।
পাশাপাশি বিএনপি বলছে, ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ আবার একতরফা নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু একতরফা নির্বাচন করলে তা দেশের ভেতরে ও বাইরে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।
প্রসঙ্গত,আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, এর অংশ হিসেবে দলটি রাজপথের নিয়ন্ত্রণও নিতে চায়। সে জন্য তারা বিএনপির আন্দোলনের পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকছে। সারা দেশের দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্বাচনের বার্তা দিতে ৩০ জুলাই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বর্ধিত সভা ডাকা হয়েছে। ঢাকার এই সভায় দলের জেলা-উপজেলার নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। গত বুধবার গণভবনে ১৪ দলের নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
ক্ষমতাসীন দলটি ১৪ দলীয় জোটকেও সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। সেই বৈঠকে তিনি আগের তিনটি নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় আগামী জাতীয় নির্বাচনও জোটগতভাবে করার কথা বলেছেন। ১৪ দলীয় জোটের একটি শরিক দলের শীর্ষ নেতা দিলীপ বড়ুয়া দেশ বর্তমানকে বলেছেন, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সেভাবেই অগ্রসর হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্বাচন নিয়ে শরিকদের মনে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই।
আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দলের বৈঠকে ঢাকাসহ সারাদেশে জোটগতভাবে সভা-সমাবেশ করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা জানিয়েছেন, তাঁদের জোটের বাইরে জাতীয় পার্টি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে বলে তাঁরা মনে করছেন। এ ছাড়া বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে নেই এমন কিছু দলকেও নির্বাচনে আনার চেষ্টা তাঁদের রয়েছে।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্য রয়েছে, এ ধরনের ১৫-২০টি দলের একটি জোট গঠনেরও প্রক্রিয়া চলছে অনেক দিন ধরে। এর প্রায় সবকটিই ইসলামি দল। এই জোট গঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের চেয়ারম্যান মিছবাহুর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, তাঁদের জোট গঠনের উদ্যোগ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, আওয়ামী লীগ চাইছে, ১৪ দল এবং জাতীয় পার্টির বাইরে আরও বেশ কিছু দল ও জোট নির্বাচনে অংশ নিক। তাতে নির্বাচনে বিভিন্ন দল ও জোটের অংশগ্রহণ দেখানোর বিষয়টি সহজ হবে।
নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে যুক্তরাষ্ট্র গত মে মাসে বিধিনিষেধ দিয়ে নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করে। এরপর চলতি জুলাই মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া ঢাকায় সফরে এসেছিলেন। তিনি নির্বাচন ও মানবাধিকার ইস্যুতে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলেছেন। এ ছাড়া নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানোর বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধিদলও ঢাকা সফর করছে। ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকদের তৎপরতাও এখন চোখে পড়ার মতো। তাঁরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা যেমন বলছেন, একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের কথাও তাঁরা বলছেন।
এই পরিস্থিতি একধরনের চাপ তৈরি করলেও সরকার তা কার্যত উপেক্ষা করছে। ১৪ দলের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পাটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, বিদেশিদের তৎপরতাকে সরকার আমলে নিচ্ছে না। ১৪ দলও সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচন করার পক্ষে রয়েছে।
তবে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন, বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতা নিয়ে সরকার ও দলের বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রকাশ্যে কঠোর মনোভাব দেখানো হলেও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো যাতে একতরফা বিরোধী দলের দিকে ঝুঁকে না যায়, সেই ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু বিরোধী দলের দাবিতে কোনো ছাড় দেবে না সরকার।
শুরু থেকেই বিএনপির নির্দলীয় সরকারের দাবির ব্যাপারেও প্রকাশ্যে কোনো ছাড় না দেওয়ার অবস্থানে ছিল আওয়ামী লীগ। এখন তাদের এক দফা দাবিকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ আরও কঠোর অবস্থানে গেছে। এ বিষয়ে সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী বলেন, বিএনপিকে নির্বাচনে আনা বা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের বিষয়ে এত দিন আওয়ামী লীগের ভেতরে কেউ কেউ চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু এক দফা ঘোষণার পর আর কোনো ছাড় না দেওয়ার বিষয়ে দলের ভেতরে এখন কোনো ভিন্নমত নেই। বিএনপি সেপ্টেম্বর মাসে আইনশৃঙ্খলার বিঘ্ন ঘটানো বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। এমন ধারণা থেকে যথাসময়ে নির্বাচন করার লক্ষ্যে সরকার আরও কঠোর হতে পারে।
তবে বিএনপির নেতারা পরিস্থিতিটাকে ব্যাখ্যা করছেন ভিন্নভাবে। তাঁরা মনে করেন, তাঁদের আন্দোলনের শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ কোনো ছাড় না দেওয়ার কথা বলে আসছে। এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমে বলেন, ‘আমরা বাধ্য হয়ে এক দফা আন্দোলনে গেছি। এখন ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ একতরফা নির্বাচন করতে চাইলে তা জনগণ বিচার করবে। তবে সেই নির্বাচন হলে তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।’
বিএনপির নেতারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁদের পিছিয়ে আসার আর কোনো সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের পক্ষে একতরফা নির্বাচন করা আগের মতো আর সহজ হবে না বলেই মনে করেন তাঁরা। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন,সবার প্রত্যাশা সুষ্ঠু অবাধ একটি নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন সরকারের সহযোগিতায় সবাইকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দেবে এমনটা আশা দেশবাসির।