আওয়ামী লীগ ও ইসলাম ইস্যুতে অপপ্রচারের জবাব দেয়া হবে

ওলামা লীগের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন আলেম ওলামারা

আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকার কিছুটা হলেও চিন্তিত।  যে কারণে প্রধানমন্ত্রী দলীয় নেতাদের সাথে প্রতিটি বৈঠকে হুশিয়ার করছে, নির্বাচন বিগত দুটো নির্বাচনের মতো হবে না। তা বিদেশিদের চাপে হোক বা অভ্যন্তরিণ কারণে হোক সরকার নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা পূর্ণ করতে চাচ্ছে।  নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ভাবে তার কাজ করতে দিতে চাচ্ছে।  পাশাপাশি নির্বাচনের প্রক্কালে বিএনপি জামায়াত বার বার আওয়ামী লীগকে ভারতের দালাল, দেশ ভারত হয়ে যাবে,মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে বলে নানা অপ্রচার করেছে। এবারে সেই অপপ্রচারের পাল্টা জবাব দিতে আওয়ামী ওলামা লীগের নেত্বত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল ইসলামী দলগুলোকে মাঠে নামানো হচ্ছে। গোছানো হচ্ছে ওলামা লীগকেও।  দীর্ঘ ২৭ বছর পর আগামী ২৯ এপ্রিল আয়োজন করা হচ্ছে সম্মেলন।

এ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও  সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।  সম্প্রতি আওয়ামী ওলামা লীগের বিভিন্ন অংশের নেতারা ঐক্যবদ্ধ ভাবে ওবায়দুল কাদেরের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।  তিনি নিজেই প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপ করে সম্মেলনের তারিখ দিয়েছেন।

ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ইসলামী দল গুলোর কাজ মানুষকে সৎপথে চলার পরামর্শ দেয়া।  কারো প্ররোচনায় কোন দলের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হওয়া নয়। আওয়ামী লীগ সরকার যখনই ক্ষমতায় এসেছে,ইসলামের পক্ষে কাজ করেছে।  ইসলামি শিক্ষার প্রসারে উদ্দ্যেগ নিয়েছে। মসজিদ মাদ্রাসার উন্নয়নে  কাজ করেছে। অনেকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ইসলাম নিয়ে অপপ্রচার চালায় যা সঠিক নয়।

এদিকে গত ৪ এপ্রিল রাজধানিতে ইসলামী ঐক্যজোটের এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র মোকাবেলার আহবান জানিয়েছেন।

তিনি বলেছেন,দেশে নানা ষড়যন্ত্র চলছে।  ২০০৮ সালের নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যে ইসলামী দলগুলো আমাদের সাথে ছিল, তাদেরকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময় এসেছে।  তাতে ষড়যন্ত্র মোকাবেলা ও আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণে ভোটের মাধ্যমে সরকার নির্বাচিত করার পথ আরো সুগম হবে।

আওয়ামীলীগের নীতিনিধারনী দুইজন নেতার সাথে আলাপে জানা গেছে, নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ও সরকারকে ইসলামবিদ্বেষী হিসেবে তুলে ধরে ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা জোরালো হতে পারে।  সেটা যাতে না হয় তার জন্য দলীয় মতাদশের অনুসারী আলেম-ওলামাদের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।  সে লক্ষ্যে একাধিক ভাগে বিভক্ত ওলামা লীগের সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ করে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন সামনে রেখে বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।  কূটনীতিকদের মাধ্যমে সরকারকে চাপে রাখার পাশাপাশি নানা ইস্যুতে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতে ইসলামের একটি অংশ।  অন্য সব ইস্যুর পাশাপাশি পুরোনো কৌশল অবলম্বন করে সরকারকে ইসলামবিদ্বেষী ও আলেম-ওলামাদের প্রতি বিরূপ এমন প্রচার চালিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে এই গোষ্ঠী।

আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা নিজেকে প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গত তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ইসলাম তথা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কল্যাণে নানা পদক্ষেপ নিলেও তা সাধারণ মানুষের কাছে সঠিকভাবে বা সঠিক পন্থায় তুলে ধরা যায়নি।  সারা দেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদ এর সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত।  এ ছাড়া কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দিয়ে আলেম-ওলামাদের যে সম্মান শেখ হাসিনা দিয়েছেন তা অতীতের কোনো সরকারের আমলে দেখা যায়নি।’

তিনি বলেন, এত কিছু করার পরেও একটি অংশ সরকারকে বারবার ইসলামের মুখোমুখি দাঁড় করানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।  আর এ কাজটি করছে বিএনপি, জামায়াত ও হেফাজতের একটি অংশ।  তারা সাধারণ মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, এই সরকার ইসলামের বিরুদ্ধে।  আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে মিথ্যমামলা দিয়ে তারা হয়রানি করছে।  জেলে বন্দি রাখছে।

উদাহরণ হিসেবে তারা দাবি করছে, হেফাজতে ইসলামের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হককে সরকার অন্যায়ভাবে মামলা দিয়ে জেলে বন্দি করে রেখেছে। আওয়ামী লীগের লোকেরা এর বিরোধিতা করে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরলেও সাধারণ মানুষ তা পুরোপুরি আস্থায় নিতে চায় না।  এ ক্ষেত্রে আলেম-ওলামারা যদি প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে এসব অপপ্রচারের বিরোধিতা করেন তাহলে সেটা অনেক বেশি কাজে দেবে।  মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করাও সম্ভব হবে।  এজন্যই ওলামা লীগকে যথাযথভাবে সক্রিয় করার কথা ভাবা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা এই বিষয়ে বলেন, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন না হলেও এর মতোই হচ্ছে ওলামা লীগ।  আগামী ২৯ এপ্রিল এই সংগঠনের সম্মেলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের আদর্শে বিশ্বাসী আলেম-ওলামাদের ঐক্যবদ্ধ করা হবে।  আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের সামনে প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে এই আলেম-ওলামারা ভূমিকা রাখবেন।

আলেম-ওলামাদের সঙ্গে সংযোগের এই ধারাটিকেই আবার সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।  এরই ধারাবাহিকতায় গত ২০ ফ্রেব্রুয়ারি ৯টি ধারাকে একত্রিত করে রাজধানীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে মতবিনিময়ের পর সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।  আওয়ামী লীগ সভাপতির সম্মতি নিয়ে ২৯ এপ্রিল রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জাতীয় সম্মেলনের তারিখ চূড়ান্ত করা হয়।  সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বলেও জানানো হয়েছে।

সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক ড. কে এম আবদুল মোমেন সিরাজি বলেন, ‘ওলামা লীগের সবপক্ষকে একত্রিত করে ২৯ এপ্রিল সম্মেলন হতে যাচ্ছে।  সাত বিভাগে প্রতিনিধি সম্মেলন শেষ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘সারা দেশে জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে ওলামা লীগের নেতাকর্মী সমর্থক রয়েছে।  সাত থেকে সাড়ে সাত লাখ আলেম-ওলামা এই সংগঠনে যুক্ত রয়েছেন।’

আওয়ামী ওলামা লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির যুগ্ম আহবায়ক মুফতী মাসুম বিল্লাহ দেশ বর্তমানকে বলেন, দীর্ঘদিন পরে ওলামা লীগের সম্মেলন হতে যাচ্ছে। এটাই ওলামা লীগের প্রথম সম্মেলন।  সম্মেলন করার জন্য আহবায়ক কমিটি করা হয়েছে।

মাসুম বিল্লাহ বলেন, ওলামা লীগ হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনো সংগঠন নয়।  ১৯৬৯ সালের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী ওলামা পার্টি গঠন করেন।  ওলামা পার্টি থেকে ওলামা লীগের সৃষ্টি।  ওলামা পার্টি ৬ দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করেছে।  স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার অনুমতিক্রমেই আওয়ামী ওলামা লীগ রাজনৈতিকভাবে দ্বিতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগের হয়ে দলীয় কর্মসূচি শুরু করে।

সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির এই নেতা বলেন, চারদলীয় জোট সরকারের জুলুম নির্যাতন নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি ও নেত্রীর (শেখ হাসিনা) কারামুক্তিসহ জামায়াত-বিএনপির আগুন সন্ত্রাস প্রতিরোধে ওলামা লীগ গুরুত্বপূর্ণ  ভূমিকা পালন করেছে। আলেম ও ওলামাদের মধ্যে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে, সম্প্রীতির পক্ষে তারাই ওলামা লীগ করে। যারা স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী কিংবা আওয়ামী লীগের নীতি-আদর্শবিরোধী তারা কেউ ওলামা লীগে থাকতে পারবে না।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু নিজেই ১৯৬৯ সালে আওয়ামী ওলামা পার্টি গঠন করেন।  তখন নেতৃত্বে ছিলেন মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সবকিছুর পটপরিবর্তন হয়।  পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালে ওলামা পার্টি নতুন করে আওয়ামী ওলামা লীগে রূপান্তরিত হয়।  সেসময় সংগঠনটির নেতৃত্ব দেন মাওলানা হাবিবুল্লাহ কাচপুরী।