চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৪ সংসদীয় আসন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড সংসদীয় আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ঘনিয়ে আসা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। নির্বাচনকে ঘিরে কৌতূহল ও উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে ভোটারদের মাঝেও। এটি চট্টগ্রামের ৪ নম্বর আসন হলেও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ৩০০টি নির্বাচনী এলাকার মধ্যে এটির অবস্থান ২৮১। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী (২০১৮) এই আসনে মোট ভোটার রয়েছে ৩,৯৩,২৩৭ জন।
এ আসনে আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয় দলেই গ্রুপিং-কোন্দল রয়েছে। বিএনপি-জামায়াত অধ্যূষিত এলাকা হিসাবে পরিচিত বিগত সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে নানা রাজনৈতিক ইস্যু এবং যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াত এই এলাকায় ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছিল। তবে বর্তমানে চারদলীয় জোটের তৎপরতা এখন আর সেরকম নেই।
অপরদিকে তৃণমূলের অভিযোগ আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলেও রাজনৈতিক অবস্থান সেভাবে গড়ে তুলতে পারেনি। দলে সৃষ্টি হয়েছে একাধিক গ্রুপ ও কোন্দল। নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতাকর্মীরা চাঙ্গা হলেও বিভক্তি রেখাও আরও ভালোভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ছে। এর কারণ মাঠ পর্যায়ে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের জোর তৎপরতা। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হন শিল্পপতি দিদারুল আলম। এবারও তিনি দলের মনোনয়ন চাইবেন এটা স্বাভাবিক।
এ আসনে দলের মনোনয়ন পেতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল বাকের ভূঁইয়া। পাশাপাশি মনোনয়ন চাইবেন বলে জোর গুঞ্জন আছে এই আসনের প্রয়াত সংসদ সদস্য আবুল কাশেম মাস্টারের ছেলে বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আল মামুন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মোস্তফা কামাল চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী, লায়ন মোহাম্মদ ইমরান ও চট্টগ্রাাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ফখরুদ্দিন চৌধুরী।
মনোনয়নকে সামনে রেখে এদের মধ্য অর্ধিকাংশ নেতা সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কমসূচিতে মাঠে ময়দানে সক্রিয় রয়েছেন। অন্যদিকে প্রকাশ্যে না থাকলেও ভেতওে ভেতরে এই আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও একাধিক মামলা নিয়ে বর্তমানে কারাগারে থাকা আসলাম চৌধুরী একক প্রার্থী হিসাবে বিবেচনায়, যা স্থানীয় বিএনপির ধারণা। তবে তার সাথে ঈসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ কানেকশন থাকা নিয়ে প্রশ্ন এবং একাধিক মামলা থাকায় নির্বাচনে দাঁড়ানো নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে স্থানীয় নেতা-কর্মিদের মাঝে।
বিকল্প হিসাবে আসলাম চৌধুরী পরিবারের কোন সদস্য পাশাপাশি সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের বিএসসি, উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক কাজী মো. সালাউদ্দিন, চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সভাপতি মোশারফ হোসেন দীপ্তি, কাট্টলির বাসিন্দা ও নগর বিএনপি নেতা আহমেদুল আলম চৌধুরী রাসেলসহ বেশ কয়েকজন দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদি আসলাম চৌধুরী এককভাবে নির্বাচন করতে পারে তাহলে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতের সর্মথন থাকবে বলেও মনে করছেন স্থানীয় নেতা-কর্মিরা।
স্থানীয় গনমাধ্যমকর্মীসহ প্রধান দুই দলের একাধিক নেতা-কর্মির সাথে কথা বলে দৈনিক দেশ বর্তমান। তাদের কথায় ফুটে উঠে আওয়ামী লীগে তিনটি গ্রুপ বর্তমানে তিন ধারায় বিভক্ত। যার মধ্যে ক্লিন ইমেজ খ্যাত বর্তমান সাংসদ দিদারুল আলম কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে দিদার গ্রুপ, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল বাকের ভূঁইয়ার কর্মি-সর্মথকদের নিয়ে গড়া উঠা বাকের গ্রুপ ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আল মামুনের কর্মি-সমর্থকদের নিয়ে গড়া উঠা মামুন গ্রুপ। তাদের তিন গ্রুপের নেতা-কর্মিদের প্রত্যাশা তাদের স্ব স্ব নেতারা দলীয় মনোনয়ন পাবেন।
ফলে সীতাকুণ্ডে আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে দলীয় কোন্দল ও গ্রুপিং রাজনীতির অবসান ঘটাতে না পারলে নির্বাচনে দলের ভরাডুবি হতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। বর্তমানে গ্রুপিং ও কোন্দলের কারণে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
অন্যদিকে বিএনপিতে প্রকাশ্য গ্রুপিং কিংবা বিরোধ না থাকলেও ভেতরে ভেতরে বিভেদ স্পষ্ট। তবে বিএনপি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকায় অনেকটাই নিস্তেজ। সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় থাকা অধিকাংশ প্রার্থীই শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবুও আগামী নির্বাচনে আসলাম চৌধুরী আইনিভাবে ভোটে দাঁড়াতে না পাড়লে, বিএনপি থেকে মনোনয়ন নিয়ে একাধিক প্রার্থীর লড়াই চলবে যা স্পস্ট। তবে স্থানীয় নেতা-কর্মিদের অনকের ধারণা আসলাম চৌধুরী একক প্রার্থী তার বিকল্প কেউ নেই।
ফলে এই আসনে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে তুমুল প্রতিদন্দ্বীতা হবে। তবে দুই দলেই কোন্দল মিটিয়ে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে পারলে জেতার সমীকরণ সহজ হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।