ভুল চিকিৎসায় আঁখির মৃত্যু: ডা. সংযুক্তা সাহাকে গ্রেফতারের দাবি
ছয় জনের বিরুদ্ধে মামলা, দুই চিকিৎসক গ্রেফতার
সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা ও কর্তৃপক্ষের অবহেলায় মাহবুবা রহমান আঁখি মারা যান রোববার (১৮ জুন ) দুপুরে রাজধানীর আরেক হাসপাতাল ল্যাবএইডে। দুপুর সোয়া ২টার দিকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন আঁখির স্বামী ইয়াকুব আলী সুমন। তিনি বলেন, চিকিৎসকরা বলছেন মারা গেছে। আমার সবকিছুই শেষ।
তবে আঁখির মৃত্যুর ঘটনায় গত বুধবার (১৪ জুন) সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা ও কর্তৃপক্ষের অবহেলায় মাহবুবা রহমান আঁখির প্রসূতি মৃত্যুঝুঁকিতে পড়েন বলে অভিযোগ করেন তার স্বামী ইয়াকুব আলী। তিনি দাবি করেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় মারা গেছে তাদের নবজাতক সন্তান।
এদিকে আঁখির মৃত্যুর ঘটনায় গত বুধবার ধানমন্ডি থানায় মোট ছয় জনের নাম উল্লেখসহ পাঁচ থেকে ছয় জনকে অজ্ঞাত আসামি করে ‘অবহেলাজনিত মৃত্যুর’ অভিযোগ এনে একটি মামলা করা হয়। মামলায় হওয়ার পরে অভিযুক্ত দুই চিকিৎসক ডা. শাহজাদী ও ডা. মুনাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- ডা. মিলি, সহকারী জমির, এহসান ও হাসপাতালের ম্যানেজার পারভেজ।
অপরদিকে আঁখির মৃত্যুর ঘটনায় ডা. সংযুক্তা সাহার গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে ইডেন কলেজে অধ্যয়নরত সহপাঠীরা।
জানা গেছে, তিন মাস ধরে সেন্ট্রাল হাসপাতালের গাইনি ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সংযুক্তা সাহার অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন মাহবুবা রহমান আঁখি। এমনকি তার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল বলেও চিকিৎসক জানিয়েছিলেন। নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমেই সন্তান প্রসব সম্ভব বলে আশ্বস্ত করেছিলেন ডা. সংযুক্তা সাহা।
প্রসব ব্যথা ওঠায় গত ৯ জুন রাত ১২টা ৫০ মিনিটে সেন্ট্রাল হাসপাতালে ডা. সংযুক্তার অধীনে মাহবুবাকে ভর্তি করা হয়। তখন ডা. সংযুক্তা হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, সংযুক্তা সাহা আছেন এবং ওটিতে (অপারেশন থিয়েটার) কাজ করছেন। ডা. সংযুক্তা সাহার বদলে ওই নারীর ডেলিভারি করতে যান ডা. মিলি।
এ সময় ডা. মিলি ওই প্রসূতির পেট কাটতে গিয়ে মূত্রনালি ও মলদ্বার কেটে ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হয়ে রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। অজ্ঞান অবস্থায় সিজার করে বাচ্চা বের করা হয়। এতে বাচ্চার হার্টবিট কমে গেলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নবজাতককে মৃত ঘোষণা করে।
এ অবস্থায় স্বামী ইয়াকুব আলী সেন্ট্রাল হাসপাতালের কোনো সহযোগিতা না পেয়ে পরে তার স্ত্রীকে শনিবার ( ১০ জুন) ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে তার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়।
আঁখির স্বামী ইয়াকুব আলী বলেন, সেন্ট্রাল হসপিটালে আঁখিকে যখন ওটিতে ঢোকানো হয়, তখনো ডা. সংযুক্তা সাহা হাসপাতালে আছেন কি না জানতে চাই। তখন কর্তৃপক্ষ জানায়, তিনি আছেন এবং তিনিই চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন না। রোগীর কোনোরকম চেক-আপ ছাড়াই ডেলিভারির কাজ শুরু করে দেন অন্যরা।
আঁখির মৃত্যুর কারণ জানাল ল্যাবএইড হাসপাতাল:
এদিকে প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণে আঁখির মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ল্যাবএইড হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা চৌধুরী মেহের-এ-খোদা। রোববার বিকেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন তিনি বলেন, ‘প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণে আঁখির মৃত্যু হয়েছে। এ রকমটা স্বাভাবিকভাবেই হতে পারে।’
আঁখির চিকিৎসায় ছয় সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হলেও মৃত্যুপরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে কোনো চিকিৎসক আসেননি।
মেহের-এ-খোদা জানান, গত ১০ জুন বিকেল ৩টা ৩৯ মিনিটে মাহবুবা রহমান আঁখিকে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাকে অচেতন অবস্থায় লাইফ সাপোর্টে অ্যাম্বুল্যান্সে আনা হয়েছিল। তার প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ ও হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল।তিনি বলেন, ল্যাবএইড হাসপাতালের সিসিইউতে রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছিল। রোগীর অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ছয় সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয় এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা প্রদান অব্যাহত ছিল।
ল্যাবএইডের জনসংযোগ কর্মকর্তা আরো বলেন, রোগীর ইউরিন আউটপুট বন্ধ থাকায় ডায়ালিসিস প্রদান করা হচ্ছিল। সকল প্রকার প্রচেষ্টার পরও রোগীর কোনো প্রকার উন্নতি পরিলক্ষিত হয়নি। আজ দুপুর ১টা ৪৩ মিনিটে তিনি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।
জানা গেছে, তিন মাস ধরে সেন্ট্রাল হসপিটালের গাইনি ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সংযুক্তা সাহার অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন আঁখি। তার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল বলে চিকিৎসক জানিয়েছিলেন। নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমেই সন্তান প্রসব সম্ভব বলে তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন ডা. সংযুক্তা সাহা।
ডা. সংযুক্তা সাহার গ্রেফতারের দাবি:
এদিকে রাজধানীর সেন্ট্রাল হসপিটালে ভুল চিকিৎসা ও কর্তৃপক্ষের প্রতারণায় মাহবুবা রহমান আঁখির মৃত্যুর ঘটনায় ডা. সংযুক্তা সাহার গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে ইডেন কলেজে অধ্যয়নরত সহপাঠীরা। একইসঙ্গে সেন্ট্রাল হসপিটালের লাইসেন্স বাতিলসহ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন তারা। রোববার (১৮ জুন) বিকেলে আঁখির মৃত্যুর খবরে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে এসে এমন প্রতিক্রিয়া জানান তারা।
ইডেন কলেজের অধ্যয়নরত মুনিরা আঞ্জুম বলেন, আজ আমার সহপাঠী আঁখি মারা গেল, তখন সবাই তাকে দেখতে আসছে, তার খোঁজ নিচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেন্ট্রাল হসপিটালের পক্ষ থেকে কেউ আসেনি, খোঁজখবরও নেয়নি। এমনকি যার আশ্বাসে আঁখি ঢাকায় এসেছিল, সেই ডা. সংযুক্তা সাহাও একদিন রোগীকে দেখতে আসেনি। আমরা মনে করি, সেন্ট্রাল হসপিটাল বা ডা. সংযুক্তা কেউই এই হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াতে পারে না।
তিনি বলেন, সেন্ট্রাল হসপিটাল কর্তৃপক্ষ লোক পাঠিয়ে আমাদেরকে হুমকি দেয়। বলে, কিছু দিন পর সবাই ভুলে যাবে, তোমাদের কত টাকা হইছে। কিছু দিন পর সব ঠিক হয়ে গেলে তোমাকে দেখে নেব। এভাবে আমাদের শিশুকে হত্যা ও আমাদের বোনকে হত্যা করার পর আমাদেরও হুমকি দিচ্ছে। আমরা সেন্ট্রাল হসপিটালের কাছে যাব, আমাদেরও মেরে ফেলুক।