আঁখির চিকিৎসায় গাফিলতি ছিল স্বীকার করল সেন্ট্রাল হাসপাতাল

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তদন্ত কমিটি গঠন

চিকিৎসা নিতে এসে নবজাতক হারানোর পর মা মাহবুবা রহমান আঁখির মৃত্যুতে ‘দুঃখ’ প্রকাশ করে সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, তাদের চিকিৎসায় ‘অবহেলা’ ছিল। আঁখি ও তার নবজাতক সন্তানের মৃত্যু নিয়ে তোলপাড়ের মধ্যে গতকাল সোমবার ঢাকার গ্রিনরোড এলাকার এই হাসপাতালের পক্ষ থেকে উক্ত স্বীকারোক্তি এল।

সোমবার (১৯ জুন) সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সেন্ট্রাল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক ডা. এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেন, আঁখির চিকিৎসায় হাসপাতালের অবশ্যই গাফিলতি ছিল। কী গাফিলতি ছিল, সে প্রশ্নে তিনি বলেন, গাফিলতি ছিল প্রথমত ডা. সংযুক্তা সাহার, তারপর ওটির চিকিৎসকদের। কারণ সে সময় তারা সিনিয়র ডাক্তারদের ডাকেনি।

এই ঘটনায় সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, সাত কর্ম দিবসের মধ্যে এর তদন্ত প্রতিবেদন আসার কথা। ইতোমধ্যে পাঁচ দিন চলে গেছে, আর বাকি আছে দুই দিন। আশা করছি এই সময়ের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা সম্ভব হবে।

আঁখি ও তার সন্তানের মৃত্যুর পর সেন্ট্রাল হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা নিয়ে যত অভিযোগ উঠে, সেগুলোর বিষয়েও সাংবাদিকরা প্রশ্ন রাখেন হাসপাতালটির জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক চিকিৎসক এটিএম নজরুল ইসলামের কাছে। এ হাসপাতালে একজন চিকিৎসক প্রতিদিন দেড়শ থেকে দুইশ জন রোগী দেখেন বলে তথ্য মিলেছে।

একজন চিকিৎসক এত বেশি রোগী দেখলে ভালো চিকিৎসা আসলে সম্ভব কি না- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, কোয়ালিটি সার্ভিস দিতে গেলে একজন চিকিৎসকের দৈনিক এত রোগী দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু সংযুক্তা সাহা দেখতেন, কী বলব আর এটি নিয়ে।

সংযুক্তা সাহার বিষয়টি হাসপাতাল জানত কি না এমন প্রশ্নে নজরুল বলেন, এ বিষয়ে তার ‘জানা নেই’। ডাক্তারের কাছে এলে চিকিৎসা তো মূলত তারাই দেয়। তারপর কোনো একটা ঘটনা ঘটলেই সেটা আমাদের কাছে আসে। বাইরের বিষয়গুলোতে আমাদের অবগত করা হয় না। এজন্যই আমরা এই বিষয়গুলো জানতে পারিনি, বলেন তিনি।

অস্ত্রোপচার ছাড়া সন্তান জন্ম দিতে নিজের ইচ্ছের কথা স্বামীকে জানিয়েছিলেন কুমিল্লার তিতাস উপজেলার আঁখি। সেজন্য গর্ভে সন্তান আসার পর থেকে ঢাকার সেন্ট্রাল হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সংযুক্তা সাহার চিকিৎসা নেন তিনি। প্রসবব্যথা উঠলে গত ৯ জুন মধ্যরাতে কুমিল্লা থেকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে আঁখিকে নিয়ে আসেন তার পরিবার।

আঁখির স্বামী ইয়াকুব আলীর ভাষ্য, প্রসূতিকে ভর্তির সময় চিকিৎসক সংযুক্তা হাসপাতালেই আছেন বলা হলেও আসলে তিনি ছিলেন না। সেই রাতে ওই চিকিৎসকের সহকারীরা প্রথমে স্বাভাবিকভাবে বাচ্চা প্রসবের চেষ্টা করেন। সে সময় জটিলতা তৈরি হলে অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশুটি ওইদিনই মারা যায়। সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় আঁখিকে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত রোববার দুপুরে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় সেন্ট্রাল হাসপাতালে সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসকদের অনলাইনে কোনো ধরনের প্রচারে এসেছে নিষেধাজ্ঞা।

গাইনি ও প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. সংযুক্তা সাহা ওই হাসপাতালে আপাতত কোনো বিশেষজ্ঞ সেবা দিতে পারবেন না বলে নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে একটা প্রতিনিধি দল পাঠানো হয়েছিল ওই হাসপাতালে। কোথায় অপারেশন হয়েছিল, তাদের আইসিইউ ছিল না কি না- সেটাও তারা দেখেছে। অপারেশন থিয়েটার ও আইসিইউ ‘মানসম্মত না হওয়ায়’ তাদের সব অপারেশন বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ এনে ইতোমধ্যে ধানমন্ডি থানায় মামলাও করেছেন আঁখির স্বামী। সংযুক্তা সাহার দুই সহযোগী চিকিৎসক শাহজাদী মুস্তার্শিদা সুলতানা ও মুনা সাহাকে গ্রেফতার করে ওই মামলায় কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। গত রোববার স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, ব্যাপারটি আইনি কাঠামোর মধ্যে চলে গেছে, সেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে- হচ্ছেও তাই। যারা ওখানে ওই কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তারা জেলহাজতে আছে।

এদিকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে চিকিৎসায় অবহেলার সম্মুখীন হয়ে প্রসূতি মায়ের মৃত্যু ঘটনা তদন্তে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অভিযোগ উঠেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডা. সংযুক্তা সাহার ব্যথামুক্ত নরমাল ডেলিভারির লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেখে সেন্ট্রাল হাসপাতালে এসে প্রতারণা ও ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে মারা গেছেন মাহবুবা রহমান আঁখি।

সোমবার (১৯ জুন ) ঢাকা মেডিকেল কলেজ এক অনুষ্ঠান শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানান।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মাহবুবা রহমান আঁখির মৃত্যুর ঘটনায় সাত সদস্যের টিম গঠন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাদের খুব দ্রæত রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সেন্ট্রাল হাসপাতালের আইসিইউ চালুর ব্যাপারে জানে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যদি তারা চালু করে থাকে তাহলে অন্যায় করেছে।’