অন্তরালে নির্বাচনের প্রস্তুতি

হবে জেলায় জেলায় নির্বাচনী কনসার্ট, এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে জাপা, নির্বাচনকালীন ‘ছোট’ সরকার নভেম্বরে.

নির্বাচন কমিশন ও আওয়ামী লীগ আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে চলেছে। জাতীয় পার্টিও এগিয়ে চলছে সমান তালে। জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে নয় বরং এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার পরিকল্পনা করছে। ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটের প্রায় সব সদস্যই আগামী জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তবে মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতাকর্মীরা নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে রয়েছে অন্ধকারে।

নির্বাচন প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও সম্ভাব্য দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। গত ২ আগস্ট রংপুরের সমাবেশ থেকে ভোট চেয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা কার্যত দলের হয়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় থাকতে, নির্বাচনী এলাকার দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতে এবং দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে নির্দেশনা দিয়েছেন।

এই নির্দেশনার দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রী তার নির্বাচনী এলাকা গোপালগঞ্জ-৩ আসনে গত জুলাইয়ে দুই দিন অবস্থান করেন। আগামী ১০ অক্টোবরও তিনি তার নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করবেন।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ জানান, দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের দিকে তারা পুরোপুরি মনোযোগী। তিনি বলেন, আমরা নির্বাচনের জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছি। গণসংযোগ, সরকারের সাফল্য তুলে ধরা, যোগ্য প্রার্থী খুঁজে বের করার জন্য তথ্য সংগ্রহ, সারা দেশে সমাবেশ, বিরোধ মিটিয়ে তৃণমূলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, ঘরে ঘরে যাওয়া, ভোটারদের আকৃষ্ট করা, নির্বাচনী ইশতেহারের খসড়া- সবই করছি।

এদিকে, নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কয়েকটি নির্বাচনী এলাকা পুনর্নির্ধারণ, দুটি নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং ভোট কেন্দ্রের খসড়া তালিকা তৈরির কাজ শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনী আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনীও করা হয়েছে।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আহসান হাবিব খান বলেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরে আমাদের ঘোষিত রোডম্যাপের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি- রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য নিজস্ব পরিকল্পনা আছে। নভেম্বরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে।

তিনি বলেন, নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ আমাদের ওপর নির্ভর করে না। নির্বাচনে অংশ নিতে হলে দলগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ বিষয়ে আমাদের কোনো এখতিয়ার নেই। তবে আমরা নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করব।

বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ২৯ জানুয়ারি। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন হতে হবে। এই ৯০ দিনের গণনা শুরু হবে ১ নভেম্বর থেকে।

নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি: নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কমিশন নতুন দুটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দিয়েছে এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদ করেছে। এছাড়া, ১০টি নির্বাচনী এলাকা পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং ৪২ হাজার ৩৫০টি ভোটকেন্দ্রের খসড়া তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ৬৬টি স্থানীয় পর্যবেক্ষককে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অনুমোদিত পর্যবেক্ষকের সংখ্যা কম মনে হওয়ায় ইসি আগ্রহী আরও সংস্থাকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের অনুমোদন দিতে কমিশন তাদের নীতি পরিবর্তন করছে এবং তা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কমিশন ব্যালট পেপার, মনোনয়নপত্র এবং অন্যান্য উপকরণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে।

স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, সিল, স্ট্যাম্প প্যাড, অমোচনীয় কালির কলম, অফিসিয়াল সিল, মার্কিং সিলসহ নির্বাচনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার প্রক্রিয়া নভেম্বরের মধ্যেই শেষ হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা।

আওয়ামী লীগের প্রচারণা: সরকারের অর্জন তুলে ধরে ক্ষমতাসীন দল তাদের ইশতেহার তৈরি করছে। নিজেদের অর্জন প্রচারের জন্য প্রতিটি জেলা শহরে নির্বাচনী কনসার্ট আয়োজন করবে দলটি। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রচারণা চালাতে এবং ‘বিএনপি-জামায়াত জোটের দুঃশাসন’ তুলে ধরতে সারা দেশে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ টিম। এছাড়া দলের জনপ্রিয় ও উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে বের করতে করা হয়েছে একাধিক মাঠ জরিপের কাজ। এখন চলছে সবশেষ আরেকটি জরিপ। কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী যেন দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন না করে সেটি নিশ্চিত করতে চায় আওয়ামী লীগ। তবে, কৌশলগত সতর্কতা হিসেবে ডামি প্রার্থী প্রস্তুত রাখবে দলটি। তাহলে, বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলে এই ডামি প্রার্থীদের মাধ্যমে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক দেখানো সম্ভব হবে। দলটির শীর্ষ নেতারা সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছেন, যেন তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়। আসন ভাগাভাগি নিয়ে জোটের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনাও হয়েছে আওয়ামী লীগের।

জানতে চাইলে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, আমরা জেলা পর্যায় থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম সংগ্রহ করছি। আসন ভাগাভাগি নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনা চলছে, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

আওয়ামী লীগের একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসার পর সারা দেশে নির্বাচনের সর্বাত্মক প্রচারণা শুরু হবে। এর অংশ হিসেবে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে চলতি মাসেই বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর নভেম্বরের প্রথমার্ধে মন্ত্রিসভার অল্প কয়েকজন সদস্য নিয়ে একটি নির্বাচনকালীন সরকারও গঠিত হতে পারে।

জাতীয় পার্টির প্রস্তুতি: দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় পার্টি তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হতে বলছে। যেসব নির্বাচনী এলাকায় দলটির জনপ্রিয়তা কম বলে মনে করা হয়, সেখানে শক্তিশালী প্রার্থীর খোঁজে আছে দলটি। দলের এক নেতা বলেন, তারা বিশ্বাস করেন যে সংসদে তাদের সদস্য সংখ্যা কম হলে জাতীয় পার্টি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, আমরা তৃণমূল কাউন্সিলের মাধ্যমে দলকে প্রাণবন্ত করতে চাই। আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করব ৩০০ আসনে প্রার্থী দিতে এবং এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেব।