সময় রাত সাড়ে ৮টা। আইকনিক এক্সপ্রেস কাউন্টারে এসে দাঁড়ায় ঢাকা মেট্রো-ব-১২-১৩০১। নথি বলছে, এর ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩ সালে। ট্যাক্স টোকেন মেয়াদোত্তীর্ণ। রুট পারমিটও শেষ গত বছর। একেই করা হয়েছে স্লিপার কোচ। যেই কোচেরও অনুমোদন নেই।
এরপর গাইবান্ধা-ব-১১-০০৩২ নম্বরের মেয়াদোত্তীর্ণ স্লিপার কোচে যাত্রী তুলতে দেখা যায়। নথি বলছে, সিঙ্গেল ডেকার এই বাসকে শুধু স্লিপার কোচ করেই ক্ষান্ত হয়নি মালিক, ৩২ সিটকে যেন যাদুর বলে রূপান্তর করা হয়েছে ৪৩ সিটে।
আইকনিক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাগর হোসাইন সাগরের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললে তিনি বলেন, নেগেটিভ নিউজ কইরেন না। আপনার যদি নিউজ করতে হয়, পজিটিভ কোনো প্রসঙ্গে নিউজ করেন। এইসব নিয়ে নিউজ কইরেন না। আপনার উপস্থাপনা যদি পজিটিভ না হয়, আমি যতভাবে এটাকে পজিটিভলি বলি নিউজ কিন্তু পজিটিভ হবে না।
প্রায় একই চিত্র, বেঙ্গল পরিবহনেও। সম্প্রতি একটি দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আলোচিত হয় এই পরিবহন।
বেঙ্গল পরিবহনের উপদেষ্টা মো. তাফাজ্জল হোসাইন বলেন, আপনি যদি ভাই এই জিনিসটা এইভাবে প্রেস দেন এটা কিন্তু হচ্ছে না। আপনি দেখেন প্রত্যেকটি ইয়াদে একশোটা কাগজের ভেতরে যদি আপনি নব্বইটা কাগজ দেখেন, সব ঠিক আছে।
আসলে এসব গাড়ির কোনো কাগজই নেই। নামে-বেনামে এরকম ৮শ’রও বেশি স্লিপার বাস চলছে বিভিন্ন পরিবহনের ব্যানারে। প্রশ্ন হলো-অনুমোদন নেই, তারপরও কেন, কীভাবে ও কারা তৈরি করছে এসব বাস।
ঢাকার আমিনবাজারসহ রাজধানীজুড়ে এমন অসংখ্য কারখানা রয়েছে, যেখানে নিয়মনীতি ছাড়াই অবাধে তৈরি হচ্ছে স্লিপার বাস।
বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস মালিক সমিতির সভাপতি আফতাব উদ্দিন মাসুদ বলেন, আমি বিআরটিএ-কে ম্যানেজ করেছি। আমাকে নম্বর দিছে। আমার গাড়িও তো দেখেনি। আমাকে ইফাদ করায় দিছে।
তবে, অভিযুক্ত ইফাদ অটোস কর্তৃপক্ষ বলছে ভিন্ন কথা।
ইফাদ অটোসের পরিচালক তাসকিন আহমেদ বলেন, আমরা কিন্তু প্রত্যেকটা কাস্টমারকে চ্যাসিস বেচার সময় আন্ডারটেকিং রাখি। বিআরটিএ’র অমুক ধারা অনুযায়ী তুমি টাইপ অ্যাপ্রুভালের গাড়ির বাইরে যদি বানাও, তাহলে এটার এখতিয়ার তোমার। তো ওর গাড়ির কাগজপত্র ফেইল না রাইট- এটা আমার দেখার কোনো দরকার নেই। আমার কিস্তির টাকা আসতেছে। আমার ফাইন। পুলিশ আর বিআরটিএ এই লস রেখে গাড়ি চালাতে দিচ্ছে কেন?
স্লিপার কোচের এই অনিয়মের বিষয়টি গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। সড়কে এই বাহনের বৈধতার প্রশ্নে ২০২৫ সালে উচ্চ আদালতে রিট করেছিলেন আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান।
আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান বলেন, রুল ইস্যু হওয়ার পরে বিআরটিএ মামলায় হাজির হয়েছে এবং তারা এফিডেভিট ইন অপজিশন দিয়ে সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছে তারা কোনো স্লিপার বাস চলাচলের অনুমতি দেয়নি এবং যে স্লিপার বাসগুলো বর্তমানে বাংলাদেশের রাস্তায় চলাচল করছে সবগুলো অবৈধভাবে চলাচল করছে।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে নারাজ হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তর। আর বিআরটিএ চেয়ারম্যানের মো. হাবীবুর রহামানের দাবি, স্লিপার কোচ নামে যে কিছু আছে, এটাই তিনি জানেন না।
এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, আপনি শহিদুল সাহেবের কাছে যান। উনি বলতে পারবে। আমার কাছে তো মেসেজ আসে নাই। সেক্ষেত্রে আপনি এই মুহূর্তে যে বিষয় বললেন, এগুলো শহিদুল সাহেব বলতে পারবেন।
ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার পরিচালক মো. শহিদুল্লাহর দপ্তরে গিয়ে তাকে পাননি দেশ বর্তমানের প্রতিবেদক। মোবাইল ফোনে কল করলেও রিসিভ করেননি তিনি।
নথি আর মাঠের অনুসন্ধানে একটি বিষয় পরিষ্কার। এই প্রক্রিয়া একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে স্লিপার বাসের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যেই সিন্ডিকেটে নিজ স্বার্থেই জড়িত আমদানিকারক, মালিক এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোও।