* সরকারি চাকরিবিধির ব্যত্যয়, ২৫ প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক
* এক স্থানে ১২ বছর, অদৃশ্য শক্তিতে হননি বদলী
* কানাডায় ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
* দুদকে তদন্ত পরিসমাপ্তির জন্য কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল হাসেম সরদারের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ দুর্নীতি দমন কমিশনেও জমা পড়েছে অনিয়ম, দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ। কোন অভিযোগই পাত্তা পাচ্ছে না। খোদ দুর্নীতি দমন কমিশনও তার বিরুদ্ধে আনা তদন্ত কার্যক্রমের পরিসমাপ্তি টেনেছে দুইবার।
অথচ গতবছর নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে দুর্নীতি, জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি পত্র দেয়। সেই পত্রে বলা হয়, দুর্নীতি এবং জড়িতদের কঠোর পদক্ষেপ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে অবহিত করার জন্য। এর আলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২২ সালের ডিসেম্বর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রদানের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করে। সরকারি বিধান অনুসারে একজন কর্মকর্তার একটির বেশি প্রকল্পের দায়িত্বে থাকার কথা নয়; কিন্তু আবুল হাসেম সরদার ছিলেন ২৫টি প্রকল্প পরিচালক (পিডি)র দায়িত্বে। এর আর্থিক মূল্য ৩ হাজার ৫৯১ কোটি টাকার বেশি। শুধু তা-ই নয়, বিধান অনুসারে একজন কর্মকর্তার একই জায়গায় তিন বছরের বেশি থাকার সুযোগ না থাকলেও তিনি ছিলেন বছরের পর বছর ধরে।
সম্প্রতি আরও একটি অভিযোগ দুদকে জমা দেন আব্দুর রহিম নামের এক ব্যক্তি। অভিযোগে তিনি বলেন, অবৈধ কমিশন বাণিজ্যের জোরেই গত ১২ বছরেরও বেশি সময় তিনি প্রধান কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে আছেন। অভিযোগে বলা হয়, ৫০০ কোটি টাকার পাচার করেছেন কানাডায় এবং সরকার বিরোধী আন্দোলন চাঙা করতে নিয়মিত খরচ করছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রধান কার্যালয়ে ডেস্ক-১ এ নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন একাই দেখভাল করতেন ২৫ প্রকল্প। এসব প্রকল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলে ১০০টি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ স্থাপন প্রকল্প। এই প্রকল্পের ১০০টি প্রতিষ্ঠানের নতুন ক্যাম্পাস নির্মাণের ১৭০০ কোটি টাকার টেন্ডার অনুমোদনের নামে প্রতিটি থেকে ১ কোটি ৫০ লক্ষ করে মোট ১৫০ কোটি টাকা কমিশন বাণিজ্য করেছেন। এছাড়াও ওই প্রকল্পের ১৭০ কোটি টাকার ১০টি কাজ তার নিজ পরিচিত ঠিকাদার মেসার্স ঢালী কন্সট্রাকশসকে দিয়ে ২৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো এই ১০টি প্রকল্পের কাজ ৫ বছরেও শেষ করতে পারেনি ঢালী কন্সট্রাকশন। সারাদেশের ৬৩টি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের সক্ষমতা বৃদ্ধি নামক প্রকল্পের ৬৪ টি নতুন ভবন নির্মাণ কাজের টেন্ডার অনুমোদন করানোর কমিশন বাবদ নিয়েছেন প্রায় ৩০ কোটি টাকা, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ৩২৩টি স্কুলে নতুন ৫ তলা ভবনের টেন্ডার অনুমোদনের কমিশন বাবদ নিয়েছেন ১৫০ কোটি টাকা।
ইইডি সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির প্রায় অর্ধেক কাজই প্রকৌশলী আবুল হাসেম সরদারে কব্জায় রয়েছে। তাদের মধ্যে আবুল হাসেম সরদার ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর থেকে প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন। ২৫টি প্রকল্পের দায়িত্বের পাশাপাশি ইইডি’র (৩৫টি) গাড়ির তদারকির দায়িত্বে ছিলেন। এ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে মাঠ পর্যায়ের দরপত্র ‘অনুমোদন’ এর ক্ষেত্রে আগাম দুই শতাংশ টাকা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে, দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকে এর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি)র প্রধান কার্যালয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে সদ্য পদোন্নতি পেয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল হাসেম সরদারের বিরুদ্ধে দু’টি অভিযোগ দিয়েছে। পরে, অনুসন্ধান করে অভিযোগের পরিসমাপ্ত করে চিঠি দেন দুদক।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রধান কার্যালয়ে প্রায় ১২ বছর ধরে চাকরি করছেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল হাসেম সরদার। দীর্ঘদিন একই অফিসে কাজ করার কারণে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করে ফেলেছেন তিনি। ২০২৪ সালে প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ারে বসার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। যাতে তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ কোথাও না ওঠে সেজন্য খরচ করছেন দুই হাতে। যেকোনভাবে ম্যানেজ করে ফেলছেন তার বিরুদ্ধে তোলা সব অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তাদের। মোটা অংকের টাকা দিয়ে দুদক থেকে পরিসমাপ্তির এই দুই চিঠি কিনে এনেছেন বলে জানিয়েছেন দুদকের একাধিক সুত্র। তারা জানান, এই দুই দফা পরিসমাপ্তির জন্য লেন-দেন হয়েছে কয়েক কোটি টাকা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদক সুত্র জানায়, এই ধরণের লেন-দেন এখানে ওপেন সিক্রেট। সে কারণে এমন দায়ী ব্যক্তিরা বার বার পার পেয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি)র প্রধান কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন মো. আবুল হাসেম সরদারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে টাকা পাচারের অভিযোগ উঠে। এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগ দুদকে জমা পরে। সেই অভিযোগটি আমলে নেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদক থেকে ইইডির প্রধান প্রকৌশলীকে নোটিশ পাঠানো হয়। ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে দুদকের সহকারী পরিচালক (অনুসন্ধান ও তদন্ত-১) মাহবুবুল আলম স্বাক্ষরিত নোটিশে বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২২ ধারা ও দুর্নীতি দমন কমিশন নীতিমালা-২০০৭-এর বিধি অনুযায়ী এ তদন্ত হবে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে মো. আবুল হাসেম সরদারসহ সহকারী প্রকৌশলী মো. সিরাজুল ইসলাম এবং দুই উপসহকারী প্রকৌশলী মো. জাফর আলী সিকদার ও মো. শাহজাহান আলীর বক্তব্য নেয়া হবে। পরে, তারা দুদকে হাজির হয়ে বক্তব্য দেয় এবং তা শ্রবণ ও গ্রহণ করে দুদক। পরে অদৃশ্য এক সমঝোতায় মো. আবুল হাসেম সরদারের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতি মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে টাকা পাচারের অভিযোগটি অনুসন্ধানে প্রমাণিত না হওয়ায় পরিসমাপ্ত ঘোষণা করে দুর্নীতি দম কমিশন।
জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক (অনু: ও তদন্ত-১) মাহবুবুল আলম প্রতিবেদকের কোন প্রশ্নের সদুত্তর দেননি। তিনি প্রতিবেদককে দুদক অফিসে যেতে বলেন এবং দুদক পিআরও এর সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল হাসেম সরদারের বিষয়ে কথা বলে জানা যায়, তার বাল্যবন্ধু চাঁদপুরের বিএনপি নেতা মানিকের মাধ্যমে বিএনপির তহবিলে বিশাল অংকের অর্থ প্রদান করে থাকে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই সাবেক প্রধান প্রকৌশলীকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য সারাদেশের বিএনপি জামায়াত সমর্থিত ঠিকাদারদের কাছ থেকে অবৈধভাবে ঠিকাদারি কাজ দেয়ার বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ টাকা সংগ্রহ করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, প্রধান কার্যালয়ের ডেক্স-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন মো. আবুল হাসেম সরদার প্রায় প্রতিটি জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর কাজ থেকে ২-৩% ঘুষ আদায় করতেন। আর সেই ২-৩% না দিলে ফাইল উপর উঠেও না। পাসও হয় না। আারও জানা যায়, ৯টি টিএসসি’র কাজ ঢালি কনস্ট্রাকশন নামে এর ফার্মকে দিয়েছেন তিনি। সেখান থেকেও সুবিধা নিয়েছেন।
সূত্র আরও বলছে, আবুল হাসেম সরদারের ২-৩% ঘুষ আদায় করতেন তার (ডেক্স-১)র প্রকৌশলীরা। ব্যাংকের মাধ্যমে জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীদের কাছ থেকে ঘুষ নিতেন। ব্যাংকের পাশাপাশি এখন নেন কুরিয়ার সার্ভিসে। সেই ঘুষের টাকা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আনেন তার স্টাফ ক্যাশিয়ার সহকারী প্রকৌশলী মো. শাহাজাহান আলী বলে জানায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই কর্মকর্তা।
একাধিক প্রকৌশলীর অভিযোগ, আবুল হাসেম সরদারসহ কয়েকজন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা ১০/১২ বছর ধরেই একই স্টেশনে চাকরি করছেন। তারা সকলে মিলেই এখানে গড়ে উঠেছে একটি অসাধু ‘সিন্ডিকেট’। আর সিন্ডিকেটের এইসব কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রধান কার্যালয় নিয়ন্ত্রণ করায় প্রতিষ্ঠানটির ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ার উপক্রম হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কোনঠাসা হয়ে পড়া প্রকৌশলীরা। তাদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের লোকেরাই সংস্থার সব ধরনের দরপত্র, দরপত্র পূর্ণ মূল্যায়ন ও সংশোধন এবং বদলি, পদোন্নতি, পদায়ন ও কেনাকাটাসহ সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করছেন। এক প্রকৌশলী এই প্রতিবেদককে জানান, ঐ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর সিন্ডিকেটের কব্জায় আটকে রয়েছে ইইডি। একাধিক অভিযোগকারী জানিয়েছেন, একশ্রেণির কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী এই প্রতিষ্ঠানটিকে টাকা কামানোর মেশিনে পরিণত করেছেন বহু বছর ধরে। যারা অনিয়ম দুর্নীতি করে টাকা আত্মসাৎ করে। ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে নিম্নমানের উপকরণে নির্মিত হচ্ছে ভবন। অবস্থা এমন যে, উদ্বোধনের আগেই কোনো কোনো ভবন হেলে পড়ছে। কোথাও বছর না যেতেই খসে পড়ছে প্রতিষ্ঠানের পলেস্তারা। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরো বেশি দুর্নীতিতে ভরে যাবে। তাই, উচ্চ পর্যায়ে আবার পূর্ণ তদন্ত করে দোষীদের ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি জানান প্রকৌশলীরা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকৌশলী আবুল হাসেম সরদার প্রতিবেদককে জানান, আমার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ মিথ্যা। একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে দুদকে আবেদন করেছিলো, সেই আবেদনের তদন্ত শেষে আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। সেই চিঠি আমি আপনাকেও দিতে পারি।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) দেলোয়ার হোসেন মজুমদার দেশ বর্তমানকে বলেন, সরকারি বিধি মোতাবেক একই স্থানে ১২ বছর ধরে থাকা এবং এ সময়কালীন অন্যত্র কোথাও বদলী না হওয়া সরকারি বিধির ব্যত্যয় বটে। তবে কি কারণে বা কার সহায়তায় তিনি একই স্থানে আছেন এবং ২৫টির মতো প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন, সে বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে সমানভাবে প্রকল্প বন্টনে সচেষ্ট আছি। দুর্নীতি দমন কমিশনে দেয়া অভিযোগের তদন্ত কেবল দুর্নীতি দমন কমিশনই করার এখতিয়ার রাখেন, আমি শৃংখলাভঙ্গ বিষয়ক অভিযোগ তদারকি করার এখতিয়ার রাখি। দুদক যদি তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে তদন্তের পরিসমাপ্তি প্রতিবেদন পাঠিায় সেক্ষেত্রে আমার কি করার আছে? এ বিষয়ে আমি আর কিছু বলতে চাই না।