কাগজেই শতভাগ উন্নয়ন, বাস্তবে মাঠ ফাঁকা
* লোহাগাড়ায় ‘জুন ক্লোজিং’ এড়াতে কাজ শুরুর আগেই ৯০ লাখ টাকার বিল চোট * আধুনগর, বড়হাতিয়া ও সদরে মেলেনি কাজের অস্তিত্ব; গোপনে দরপত্রের অভিযোগ
নিয়ম মেনে কাজ শেষে সরকারের অব্যয়িত টাকা কোষাগারে ফেরত পাঠানোই যেখানে আর্থিক অনুশাসনের মূল নীতি, লোহাগাড়ায় হাঁটা হচ্ছে ঠিক তার উল্টো পথে। ‘জুন ক্লোজিং’ এর বাহানায় বরাদ্দ হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে কাজ শুরুই হয়নি। এমন প্রকল্পের পকেটেও ঢুকে গেছে শতভাগ সরকারি অর্থ। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ মাঠপর্যায়ে শেষ না করেই অনিয়ম ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৯০ লাখ টাকা। সরেজমিনে আধুনগর, বড়হাতিয়া ও লোহাগাড়া সদর ইউনিয়নে ঘোষিত এসব উন্নয়নকাজের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি মেলেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাগজে-কলমে ভুয়া অগ্রগতি দেখিয়ে তড়িঘড়ি সরকারি টাকা পকেটে পুরেছে এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লোহাগাড়ায় তিনটি পৃথক খাত থেকে এ বিপুল বরাদ্দ আসে। এর মধ্যে সংসদ সদস্যের ডিও লেটারের বিশেষ বরাদ্দের ৪১ লাখ টাকা, উপজেলা উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের ৩০ লাখ টাকা এবং জাতীয় রাজস্ব তহবিলের ১৯ লাখ টাকা। সরকারি বিধি অনুযায়ী, উপ-সহকারী প্রকৌশলীর সরেজমিন পরিদর্শন ও ‘কাজ সন্তোষজনক’ প্রত্যয়নপত্রের ওপর ভিত্তি করেই উপজেলা প্রকৌশলী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিলে সই করার কথা। কিন্তু লোহাগাড়ায় মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ধার না ধরেই সই মিলিয়ে তড়িঘড়ি অর্থ ছাড় করা হয়েছে।
বাস্তবচিত্র অনুসন্ধানে নেমে দেখা যায়, জাতীয় রাজস্ব তহবিলের ১৯ লাখ টাকায় যুব উন্নয়ন অফিস, প্রকৌশল অফিস, পরিষদ ভবন, পুরোনো মুক্তিযোদ্ধা ভবন ও অভ্যন্তরীণ মাঠ সংস্কারের কথা থাকলেও ছোঁয়ানো হয়নি এক চিলতে রং বা কোদাল। উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের ৩০ লাখ টাকায় পরিষদ সড়ক, শিশু পার্ক, সভাকক্ষ ও হলরুম সংস্কারের নামে করা হয়েছে লোক দেখানো কিছু কাজ। এমনকি নথিতে উল্লেখ থাকা ‘পুকুরের গোলঘর’ নামের কোনো কাঠামোর বাস্তব অস্তিত্বই মেলেনি পরিষদ প্রাঙ্গণে।
অন্যদিকে, এমপির ডিও লেটারের ৪১ লাখ টাকার ১২টি প্রকল্পের একটিরও পূর্ণাঙ্গ কাজ শুরু হয়নি; কাগজ কেটে খুঁজলেও মিলবে না কয়েকটি প্রকল্পের ভৌগোলিক চিহ্ন। লোহাগাড়া, বড়হাতিয়া, আধুনগর, চরম্বা ও আমিরাবাদ সড়কে কোনো উন্নয়ন কাজ দেখা যায়নি। তাছাড়া নজমুন্নেসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টয়লেট নির্মাণ, অফিসার্স ক্লাবের আধুনিকায়ন এবং নির্বাহী অফিসারের বাসভবনের বাইরে দাপ্তরিক অভ্যর্থনা কক্ষ আধুনিকায়নের কোনো কাজই মাঠে গড়ায়নি।
অভিযোগ ওঠেছে, পুটিবিলা, চুনতি ও পদুয়ায় কয়েকটি সড়কে কিছুটা কাজ হলেও ইটের মানসহ সামগ্রিক নির্মাণকাজের মান অত্যন্ত নি¤œমানের। চুনতির বাসিন্দা বদিউল আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ব্রিক সলিংয়ের কাজ শেষ হতে না হতেই বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাচ্ছে। আমরা অবিলম্বে পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।’ অনিয়ম নিয়ে স্থানীয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানদের কাছে জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মাঠের করুণ দশায় ক্ষোভ ঝরে পড়ল বড়হাতিয়ার বাসিন্দা মনজুআরা বেগমের গলায়। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘শুনেছি রাস্তার নাকি টেন্ডার হয়েছে, টাকাও উঠে গেছে। কিন্তু মাঠে তো কাজের কোনো নামগন্ধই নেই! সরকারের টাকা কোথায় গেল, আমরা তার সঠিক বিচার চাই।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি একই সুরে বলেন, ‘মাঠে গেলেই বোঝা যায় কাজের মূল অবস্থা। কাজ না করেই পুরো বিল তোলার এ উৎসব খোলাচোখে দেখা যাচ্ছে। একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।’
শুধু তা-ই নয়, সরকারি নিয়ম ভেঙে উন্মুক্ত দরপত্র বা ই-জিপির মাধ্যমে নোটিশ না দিয়ে গোপনে পছন্দসই ঠিকাদারদের হাতে কাজ হস্তান্তরের অভিযোগও ওঠেছে।
কাজ শেষ হওয়া দূরে থাক, শুরুই হয়নি। তবু কীভাবে পাস হলো শতভাগ বিল? প্রশ্নের মুখে লোহাগাড়া উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাহাদ বিন মাহমুদ বলেন, ‘অর্থবছর শেষ হয়ে আসছিল। বাজেট ফেরত যাওয়ার আশঙ্কায় টাকা তুলে উপজেলা পরিষদের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে। ঠিকাদার কাজ শেষ করলে টাকা পাবেন।’ তবে কাজ শেষ হওয়ার আগেই শেষ দেখিয়ে অগ্রিম বিলে সই ও প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার আইনি ভিত্তি এবং কোন ঠিকাদাররা এসব কাজ করছেন, সে প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব না দিয়ে তিনি দিতে পারেননি। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম না বললেও ৮/৯টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন কাজ করছে বলে জানান। কাজ শেষ হওয়ার আগে বিল উত্তোলন বিধিবদ্ধ কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা একটি প্রসেস।’ বিধিবদ্ধের বিষয়ে আবার জানতে চাইলে সরকারকেও জানাতে বলেন তিনি।
বিষয়গুলো নিয়ে জানতে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মু. বায়েজীদ বিন আখন্দের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ফোন রিসিভ করেন স্থানীয় সহকারী কমিশনার (ভ‚মি) বা এসিল্যান্ড। ইউএনও দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত আছেন বলে জানান। পরেরবার স্থানীয় নাজির ফোন রিসিভ করলেও ইউএনওকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে আর সংযোগ পাওয়া যায়নি। এমনকি (হোয়াটসঅ্যাপে) ক্ষুদে বার্তারও কোনো জবাব আসেনি।
একই বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর ব্যবহৃত মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।